Cancel Preloader

পবিত্র আশুরা: একটি বিশ্লেষণ

ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা
আরবি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এ মাসের ১০ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। মানব ইতিহাসে যতগুলো দিন চিরভাস্বর হয়ে আছে, সেগুলোর মধ্যে পবিত্র আশুরা অন্যতম। পৃথিবীর ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ তারিখে সংঘটিত হয়েছে বলেই বছরের অন্যান্য দিনের চেয়ে এদিনটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও মর্যাদাশীল। সৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহ্ তায়ালা আশুরার দিনে এমন অসংখ্য ঘটনা সংঘটিত করেছেন, যা এ দিনকে বছরের অন্যান্য দিন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করেছে।


আশুরার দিবসেই মহান আল্লাহ্ আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকার্য সম্পাদন করে সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক হিসেবে আরশে সমাসীন হন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন- “নিশ্চয় তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহ্, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন ছয় দিনে, তারপর তিনি সমাসীন হন আরশে, তিনি পরিচালনা করেন প্রতিটি কাজ।” (সূরা ইউনুস ১০: আয়াত ৩)। তাই মহররমের ১০ তারিখ পবিত্র আশুরার দিনই মহান আল্লাহর অভিষেকের দিন। মানবজাতির জন্য পরম পবিত্র ও বরকতময় দিন আশুরা। এ দিনটি ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমে অন্তর্ভুক্ত।
আরবি ‘আশারা’ শব্দ থেকে আশুরা শব্দের উৎপত্তি। ‘আশারা’ মানে দশ। মহরমের দশম দিবস। সৃষ্টির সূচনা থেকেই দয়াময় আল্লাহ্ আমাদেরকে ১২টি মাস দান করেছেন। তার মাঝে ৪টি মাসকে পবিত্র ও সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন। মাস ৪টি হলো- রজব, জিলকদ, জিলহজ ও মহররম। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেন, “নিশ্চই মাসসমূহের সংখ্যা আল্লাহর কাছে বারো, আর তা সুনির্দিষ্ট রয়েছে আল্লাহর কিতাবে সেদিন থেকে, যেদিন তিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন; এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মপথ। সুতরাং এ মাসগুলোর ব্যাপারে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।” (সূরা আত্ তাওবাহ ৯: আয়াত ৩৬)। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “চারটি মাস তথা রজব, জিলকদ, জিলহজ ও মহররম মাসকে আল্লাহ্ তায়ালা সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। এ মাসগুলোর মর্যাদা আল্লাহ্ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি এ মাসসমূহের পাপকর্মকে কঠিন পাপ হিসেবে গণ্য করে থাকেন। এ মাসসমূহের নেক কাজসমূহের, গুরুত্ব প্রতিদানও তিনি অধিক পরিমাণে দিয়ে থাকেন।” (তাফসীরে তাবারী, ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৬) এ মাসের মহিমা ও তাৎপর্য অসীম। অতএব আশুরা সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
আশুরার দিবসেই মহান আল্লাহ্ আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকার্য সম্পাদন করে সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক হিসেবে আরশে সমাসীন হন। মহররমের ১০ তারিখে পবিত্র আশুরা মহান আল্লাহর অভিষেকের দিন হওয়ায় এ দশ তারিখ অর্থাৎ দশ সংখ্যাটির কসম করে মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে আয়াত নাজিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন- “কসম ফজরের সময়ের, কসম দশ রাতের।” (সূরা আল ফাজর ৮৯: আয়াত ১ ও ২) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন- “আল্লাহর বাণী- ‘আর কসম দশ রাতের।’ হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- এর দ্বারা বছরের প্রথম মাস মহররমের দশ দিন (পবিত্র আশুরাকে) বুঝানো হয়েছে অথবা জিলহজের দশদিন বুঝানো হয়েছে।” (তাফসীরে তাবারী: ৩০নং খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৮) আমার মহান মোর্শেদ, মহান সংস্কারক সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে প্রমাণ করেছেন, পবিত্র আশুরার দিবসে আল্লাহ্ তায়ালা আরশে সমাসীন হন, যে কারণে তাঁর অভিষেক উদ্যাপন উপলক্ষ্যে এদিনে জগতে অবারিত রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়।
মহান সংস্কারক সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (রহ.) বলেন, “মহররম মাসের দশ তারিখ পবিত্র আশুরার দিবসেই মহান আল্লাহ্ আসমান ও জমিনের সৃষ্টি কার্যক্রম সম্পন্ন করে সৃষ্টি জগতের প্রতিপালক হিসেবে আরশে সমাসীন হয়েছিলেন।” সেদিন আরশে সমাসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে যে অভিষেক অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেই অনুষ্ঠানে সকল আদম সন্তানের রূহসমূহ মহান আল্লাহ্কে রব হিসেবে স্বীকার করে নেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন, “[হে রাসুল (সা.)!] আপনি স্মরণ করুন (সেই সময়ের কথা), যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নিলেন তাদেরই সম্বন্ধে এবং বললেন- ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই’ তারা বলল-হ্যাঁ, আমরা সাক্ষী রইলাম।” (সূরা আল্ আ‘রাফ ৭: আয়াত ১৭২) তাফসীরে দুররে মানসুরের ৮ম খণ্ডের ৪৭২ পৃষ্ঠায় হযরত ইকরামা (রা.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা আসমান ও জমিন এবং এ দু’য়ের মাঝে যা কিছু রয়েছে, তা (সবকিছু) সৃষ্টির সূচনা করেছেন রোববার দিন। অতঃপর তিনি (সৃষ্টিকার্য সমাপ্ত করে) শুক্রবার দিন (আশুরার দিনে) আরশে সমাসীন হয়েছেন।”
হযরত আবু হুরায়রাহ (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, “আল্লাহ্ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে শুক্রবার আসরের পর সৃষ্টি করেন। (অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন বস্তুত দিনটি ছিল, মহররম মাসের দশম তারিখ পবিত্র আশুরার দিন)।” (মুসলিম শরীফের সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৫১০) গুনিয়াতুত্ব ত্বালিবীন কিতাবের ৩২৬ পৃষ্ঠায় বড়ো পির হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.) লিখেছেন, “আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন আশুরার দিনে আরশে সমাসীন হয়েছেন। আর এ বিশ্বজাহান ধ্বংসও হবে এ দিনে। সর্বপ্রথম বৃষ্টি ও আল্লাহর রহমত দুনিয়াতে বর্ষিত হয় এ আশুরার দিনেই।”
সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেবলাজান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ববাসীর নিকট প্রমাণ করেছেন, মহান রাব্বুল আলামিনের আরশে সমাসীন হওয়ার দিবস- মহররমের দশ তারিখ । আশুরার এ দিনটির মহিমা অসীম। পবিত্র আশুরা মহান রাব্বুল আলামিনের অভিষেকের দিন হওয়ার কারণেই এ দিবসের বুজুর্গি, সম্মান ও মাহাত্ম্যকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন, কোনো রাজ্যের রাজার অভিষেকের দিনটি সে স্থানের রাজা ও প্রজাদের কাছে বিশেষ স্মরণীয় ও সম্মানিত দিন। সেই দিনটি প্রজাদের জন্য চাওয়া ও পাওয়ার দিন। তাই মহান রাব্বুল আলামিন অসংখ্য ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর অভিষেকের দিনটিকে স্মরণীয় করে রেখেছেন।
আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে এ দিনে নির্বাচন করেছেন, এদিনেই আল্লাহ্ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-এর গুনাহ মাফ করেছিলেন। হযরত নূহ (আ.)-এর সময় মহাপ্রলয়কালীন তাঁর কিসতি আশুরার দিনে জুদি পাহাড়ের পাদদেশে এসে থেমে যায়। হযরত ইব্রাহিম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুণ্ড থেকে এদিনেই উদ্ধার পান এবং তিনি নিজের পুত্রকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে ‘খলিলুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। হযরত ইউনুস (আ.) মাছের উদর থেকে মুক্তি লাভ করেন এ দিনে। হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম হয় আশুরার দিনে এবং তাঁকে আল্লাহ্ আসমানে তুলে নেন এ দিনেই। হযরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ ১৮ বছর কুষ্ঠরোগে ভোগার পর আশুরার দিনে আরোগ্য লাভ করেন। হযরত ইদ্রিস (আ.)-কে এ দিবসেই জান্নাতে উঠিয়ে নেওয়া হয়। এ দিবসেই হযরত দাউদ (আ.) আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা লাভ করেন এবং হযরত সোলায়মান (আ.) হারানো রাজত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। আশুরার এ দিবসেই হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর হারানো পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.)-কে ৪০ বছর পর ফিরে পান। এ পবিত্র দিবসেই ফেরাউনের মু’মিনা স্ত্রী বিবি আছিয়া শিশু মুসা (আ.)-কে গ্রহণ করেন; আবার এ দিবসেই হযরত মুসা (আ.) স্বীয় অনুসারীদের নিয়ে লোহিত সাগর অতিক্রম করেন। পক্ষান্তরে, ফেরাউন সদলবলে লোহিত সাগরে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। মদীনার মাটি যেদিন দয়াল রাসুল (সা.)-এর পবিত্র পদস্পর্শ পেয়ে ধন্য হয়- সেদিন ছিল আশুরার দিন। এই দিন হলো প্রায় দুই হাজার নবি-রাসুলের শুভ জন্মদিন। এ পৃথিবীর অস্তিত্ব লাভের সাথে আশুরার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে, কেননা এদিনে আল্লাহ্ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন আসমান, জমিন, লওহ ও কলম। সর্বপ্রথম বৃষ্টি ও আল্লাহর রহমত দুনিয়াতে বর্ষিত হয় এ আশুরার দিনেই। পৃথিবী প্রলয়ের সঙ্গেও থাকবে এদিনের সম্পর্ক। কেননা কেয়ামত আশুরার দিবসে সংঘটিত হবে। আমরা যদি একটু হৃদয় দিয়ে সমস্ত ঘটনা পর্যালোচনা করি, তাহলে যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় তা হলো আশুরা পৃথিবীর বুকে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অনন্য উদাহরণ। কারণ, দয়াময় আল্লাহ্ এ দিবসে তাঁর প্রিয় বন্ধু, যাঁদের দায়িত্বই ছিল পৃথিবীর বুকে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা; তাঁদের কল্যাণার্থে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন রেখেছেন।
আশুরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আপসহীন সংগ্রামের এক মহান আদর্শ, কেননা মোহাম্মদী ইসলামকে জগতে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য কারবালার মরুপ্রান্তরে ৬১ হিজরির এ দিনেই সাইয়্যেদুল আম্বিয়া হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, আমিরুল মু’মিনিন শেরে খোদা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু ও খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা.)-এর হৃদয়ের ধন, মোহাম্মদী ইসলামের অকুতোভয় বীর সেনানি ইমাম হোসাইন (রা.) মাত্র ৭২ জন সহযোগী নিয়ে দুরাচার এজিদের ২২ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে শাহাদত বরণের মাধ্যমে সত্য ও ন্যায়ের এক মহান আদর্শ স্থাপন করেছেন। এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে মোহাম্মদী ইসলাম ও এজিদী ইসলামের মাঝে বিরাজমান পার্থক্য।


সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আপসহীন সংগ্রামের এক মহান আদর্শ আমরা আশুরা হতে পাই। দয়াল রাসুল (সা.) পূর্ব থেকেই এ ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন, সবাইকে এ বিষয়ে বলেছেন। ইমাম হোসাইন (রা.) নিজের শাহাদত ও এর ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। মোহাম্মদী ইসলাম যে ধ্বংসের সম্মুখীন ইমাম হোসাইন (রা.) তা জানতেন। তাই মারওয়ান যখন মদীনাতে ইমামকে এজিদের হাতে বাইয়াত হতে প্রস্তাব দেয়, তখন তিনি বলেছিলেন, “… অবশ্যই ইসলামকে চির বিদায় জানাতে হবে যখন উম্মত এজিদের মতো রাখালের (নেতা) কবলে পড়েছে অর্থাৎ যখন এজিদের মতো ব্যক্তি মুসলমানদের নেতৃত্বে এসেছে তখন এটা স্পষ্ট যে, ইসলাম কী ধরনের পরিণতির স্বীকার হবে। যেখানে এজিদ থাকবে, সেখানে ইসলাম থাকতে পারে না। আর যেখানে ইসলাম থাকবে, সেখানে এজিদ থাকতে পারে না।” ইমাম হোসাইন (রা.) নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি। তিনি জানতেন তাঁর শাহাদত ও পরিবারের বন্দিত্ব বরণের মধ্য দিয়ে বনি উমাইয়ার প্রকৃত চেহারা এবং ইসলাম ও হযরত রাসুল (সা.)-এর সাথে শত্রুতার বিষয়টি স্পষ্ট হবে। আর সকলের মাঝে উমাইয়াদের প্রতি ঘৃণা জাগ্রত হবে। জনগণ তাদের বিপদগামিতার বিষয়টি বুঝতে পারবে। বিশ্বের বুকে আশুরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আপসহীন সংগ্রামের এক মহান আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।


আশুরা অত্যাচারীদের মুখোশ উন্মোচন করে। শিশু ও নারীগণ যাঁদের কোনো যুদ্ধাস্ত্র ছিল না, তাঁরাও আঘাত, নির্যাতন, অপমান, অপদস্থ ও তীব্র মানসিক কষ্টের শিকার হন। আহলে বাইতের সদস্যদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে মোহাম্মদী ইসলামের উত্থান হয়েছে। আশুরার দিন শত্রুবাহিনী বেষ্টিত হয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) বলেন, “যে আমাকে অনুসরণ করবে সে হিদায়েত পাবে, যে আমার বিরোধিতা করবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু তোমরা সবাই আমার বিরোধিতা করছ, আমার কথায় কর্ণপাত করছ না! কেননা, তোমাদের পেট হারাম মালে পূর্ণ হয়ে আছে এবং তোমাদের অন্তরে মোহর মারা হয়েছে, আফসোস তোমাদের জন্য! তোমরা কেন আমার কথা শোনার জন্য নীরব হচ্ছ না।” কারবালার ঘটনা যুগ যুগ ধরে মানুষের মাঝে আহলে বাইতের আদর্শ ও দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করে যাবে। আর এ দর্শন হলো সত্য ও ন্যায়ের দর্শন।


কারবালার ঘটনার অন্যতম উল্লেখযোগ্য তাৎপর্য হচ্ছে নবিদৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতি তাঁর পরিবারের সকল সদস্য ও কতিপয় আশেকে রাসুলের আনুগত্য, গভীর অনুরাগ প্রকাশ এবং জীবন উৎসর্গের দৃঢ় প্রত্যয়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ৯ই মহররম সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবারের সদস্য ও সাথিদের উদ্দেশ্যে বলেন, “হে আমার আত্মীয়স্বজন ও সাথিরা! আপনারা অত্যন্ত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে আমার সাথে থেকে এতটুকু পথ অতিক্রম করে আপনাদের ইমান ও ধৈর্যের যথেষ্ট পরিচয় দিয়েছেন। মহান আল্লাহ্, হযরত রাসুল (সা.) এবং আমি আপনাদের এই ইমানি পরীক্ষায় সন্তুষ্ট। কিন্তু আমি চাই না শুধুমাত্র আমার জন্য আপনারা এজিদ বাহিনীর হাতে শহিদ হন। তারা শুধু আমাকেই চায়, আপনাদের নয়। সুতরাং আপনারা কেন শুধু তাদের হাতে শহিদ হতে যাবেন। আপনাদের জীবন আপনাদের এবং আপনাদের আত্মীয়স্বজনদের নিকট অতি মূল্যবান। আমি আমার সমস্ত দায়দায়িত্ব থেকে আপনাদের মুক্তি দিলাম। আপনাদের উপর আমার কোনো দাবি নেই এবং আপনাদের এই সহযোগিতা ও সহনশীলতার জন্য আমি আল্লাহ্ তায়ালা ও হযরত রাসুল (সা.)-এর দরবারে সাক্ষী হবো। আপনারা সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। আপনারা এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে এবং এখান থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নিতে যাতে কোনো অসুবিধে না হয় এজন্য আমি আমার প্রদীপ নিভিয়ে দিলাম। এই বলে তিনি তাঁর প্রদীপ নিভিয়ে দিলেন।


কিছুক্ষণ পর ইমাম হোসাইন (রা.) প্রদীপ জ্বালালেন, দেখতে পেলেন সাথিরা প্রত্যেকে একে অপরের হাত ধরে আছেন এবং কেউই সেখান থেকে প্রস্থান করলেন না, সবার চোখ অশ্রু আপ্লুত। তারা সবাই বললেন, ‘হে ইমাম! আপনার তুলনায় আমাদের প্রাণ অতি তুচ্ছ! আমাদের দেহে প্রাণ থাকতে দুশমনের একটি আঁচড়ও আপনার দেহ মোবারকে পড়তে দেবো না।’ (কারবালা ও মুয়াবিয়া, সৈয়দ গোলাম মোরশেদ, পৃষ্ঠা ১২৮)


এই ঘটনা প্রমাণ করে, সত্যিকার আশেকে রাসুলেরা ইমাম হোসাইন (রা.)-কে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। নবিদৌহিত্রের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আজও তাঁরা নবি প্রেমিকদের হৃদয়ে অত্যুজ্বল হয়ে আছেন। কারবালার আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো- ৯ই মহররম রাতে ইমাম হাসান (রা.)-এর স্ত্রী হযরত উম্মে ফারওয়া (রহ.) তাঁর পুত্র ১৯ বছরের হযরত কাসিম (রহ.)-কে ডেকে বলেন, “আগামীকাল সকালে সবাই নিজেদের ভাই, সন্তান, আত্মীয়স্বজন ইমাম হোসাইন (রা.)-এর জন্য তাঁদের নিজেদের জীবন উৎসর্গ করবে। আজ যদি তোমার পিতা ইমাম হাসান (রা.) জীবিত থাকতেন, তাহলে এই মহাবিপদের সময় নিশ্চয় তিনি ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পক্ষে শহিদ হতেন। এখন তুমি আমার ভরসা, তুমি তোমার শ্রদ্ধেয় চাচাজানের নিকট যাও এবং যুদ্ধ করার অনুমতি নিয়ে এসো। হযরত কাসিম (রহ.) যখন ইমাম হোসাইন (রা.)-এর নিকট যুদ্ধের অনুমতির জন্য গেলেন, তখন ইমাম হোসাইন (রা.) বললেন, ‘তুমি আমার ভাইয়ের স্মৃতি! তোমাকে কিছুতেই অনুমতি দেওয়া যাবে না। তোমার পিতার শোকই তোমার মায়ের জন্য যথেষ্ট। এই বলে তিনি ফিরিয়ে দিলেন।’
হযরত কাসিম (রহ.) তাঁর মায়ের নিকট এসে বললেন, ‘চাচাজান! আমাকে কিছুতেই অনুমতি দিতে চাচ্ছেন না।’ তখন হযরত উম্মে ফারওয়া (রহ.) বললেন, ‘তোমার পিতা আমাকে বলেছেন, যখন তুমি কোনো মহাসংকটে পড়বে, তখন কাসিমের হাতে যে তাবিজ রয়েছে, তা খুলে পড়ে সেটাতে আমল করবে।’ তাবিজ খোলা হলে দেখা গেলো সেখানে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে সম্বোধন করে লেখা আছে- ‘ভাই হোসাইন! আমি থাকবো না, আমার পক্ষ থেকে এই হাদিয়া কবুল করে নিও।’ হযরত কাসিম (রহ.) সেই লেখাটা নিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে দিলেন। ইমাম হোসাইন (রা.) ভাইয়ের চিঠি পড়ে হযরত কাসিম (রহ.)-কে বুকের সাথে জড়িয়ে অঝোর নয়নে কাঁদলেন এবং যুদ্ধের অনুমতি দিলেন।” (্ঐতিহাসিক কারবালা, ড. এস. এম. ইলিয়াছ, পৃষ্ঠা ৫৯)
সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইমাম হাসান (রা.)-এর নিঃস্বার্থ ত্যাগের ঘটনা আজও আশেকে রাসুলেরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
কারবালার অসম যুদ্ধে ইমাম হাসান (রা.)-এর তিন পুত্র হযরত কাসিম (রহ.), হযরত আবদুল্লাহ্ (রহ.) ও হযরত আবু বকর (রহ.) এবং ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পুত্র হযরত আলী আকবর (রহ.) ও ৬ মাসের পুত্র হযরত আলী আসগার (রহ.) শহিদ হন। শেরে খোদা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু ও নবিনন্দিনী হযরত ফাতেমা (রা.)-এর কন্যা হযরত জয়নব (রা.) এর ২ পুত্র হযরত আওন (রহ.) ও হযরত মুহাম্মদ (রহ.) শহিদ হন। এছাড়া হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বৈমাত্রেয় ৬ ভাই ও অনেক নিকটাত্মীয় শহিদ হন। মূলত কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.) ধৈর্যের চরম পরীক্ষায় জয়ী হন। নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তাই জনৈক কবি বলে গেছেন-
কাটায়া ছেরকো সিজদেমে এই উম্মত কি খাতির
হোসাইন আগার সত্তকছে ছের না কাটা তে,
তো হাম আজ শানছে ছের নেহি উঠা ছেকতে।


অর্থাৎ- ইমাম হোসাইন (রা.) যদি আল্লাহর রাহে নিবেদিতভাবে সেদিন ছের (মাথা) না কাটাতেন, তাহলে উম্মতে মোহাম্মদি (সা.) মর্যাদার সাথে কোনো দিনও মাথা তুলতে পারতেন না। তাইতো হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.) বলেছেন-
‘শাহ আস্ত হোসাইন, বাদশাহ আস্ত হোসাইন।
দ্বিন আস্ত হোসাইন, দ্বিন পানাহ আস্ত হোসাইন
সার দাদ, ওয়া না দাদ দাস্ত দার দাস্ত ইয়াজিদ
হাক্কাকে বেনয়ে লা-ইলাহা আস্ত হোসাইন।’
অর্থাৎ আধ্যাত্মিক জগতের সত্তাই হলেন হোসাইন, বাদশাহ হলেন হোসাইন, ধর্ম হলেন হোসাইন, ধর্মের আশ্রয়দাতা হলেন হোসাইন। দিলেন মাথা, না দিলেন হাত, ইয়াজিদের হাতে। সত্য তো এটা যে, লা-ইলাহার সমস্ত স্তম্ভ হলেন হোসাইন।
অথচ পরিতাপের বিষয় এই যে, পবিত্র আশুরাকে অনেক মুসলমান শিয়াদের অনুষ্ঠান বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। সৃষ্টিজগতের সমস্ত মানুষের জন্য আশুরার দিন সবচেয়ে সম্মানিত ও পবিত্র। আমার মহান মোর্শেদ মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, আম্বিয়ায়ে কেরামের ধর্মের দায়িত্ব ও বেলায়েত লাভকারী সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেবলাজান বলেন, “মূলত ধর্ম না জানার ফলে আমরা সত্য থেকে দূরে সরে পড়েছি, মিথ্যাকে সত্য বলে গ্রহণ করেছি। ফলে ধর্মপালন করেও আমরা রিপুর তাড়না থেকে মুক্তি পাচ্ছি না, জীবনে শান্তি পাচ্ছি না।… পবিত্র আশুরার দিনের ইজ্জতের খাতিরে মহিমান্বিত আল্লাহ্ এ দিবসে অসংখ্য নবি-রাসুলকে কঠিন কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এ পবিত্র দিনের বুজুর্গি সম্পর্কে অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহর মহাসত্য জেনে, আল্লাহর পরিচয় লাভ করে এ পবিত্র দিনে আমরা যদি মুক্তির জন্যে তাঁর হুজুরে রোনাজারি করি, তিনি কি আমাদের মুুক্তি দেবেন না? আমরা যদি আল্লাহর অভিষেক অনুষ্ঠানকে সত্য জেনে মহব্বতের সাথে আল্লাহর বন্ধুগণের প্রদর্শিত নিয়ম মোতাবেক এ দিবসটি পালন করতে পারি, অবশ্যই তিনি আমাদের প্রতি দয়া করার কথা।”


১৯৮৮ সালের ১০ই মহররম আশুরার দিবসেই মহান রাব্বুল আলামিন সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেবলাজানকে যুগের ইমামের দায়িত্ব প্রদান করেন। কারবালার নির্মম ঘটনার প্রায় চৌদ্দশ’ বছর পর মোহাম্মদী ইসলামকে পুনর্জীবিত করার লক্ষ্যে মহান সংস্কারক মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেবলাজান ১৯৮৫ সালের আশুরার দিবসে দেওয়ানবাগ শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর কর্মময় জীবনে তিনি মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ বিশ্বময় তুলে ধরেন। মহান মোর্শেদ দয়া করে জগদ্বাসীর জন্য মোহাম্মদী ইসলামের রূপরেখা তথা আশেকে রাসুলগণের মুক্তির পথনির্দেশনা প্রদান করেছেন। পরম করুণাময়ের দরবারে প্রার্থনা, মহান মোর্শেদের ইচ্ছা অনুযায়ী আমরা যেন সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে পারি।
এ বছর পবিত্র আশুরায় দেওয়ানবাগ শরীফের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পূর্ণ হবে ইনশাল্লাহ। পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামিনের সাহায্য চাই, তিনি যেন আমাদেরকে যথাযথ মর্যাদার সাথে তাঁর মহিমান্বিত অভিষেকের দিন উদ্যাপনের তৌফিক দান করেন। মহান রাব্বুল আলামিনের অপার দয়ায় বছর ঘুরে আবার আমাদের মাঝে মুক্তির সেই পবিত্র আশুরা সমাগত। এটি আমাদের জন্য আল্লাহর ক্ষমা লাভের এক মোক্ষম সুযোগ। আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে- আশুরার দিবসে আল্লাহ বসেন আরশে, আশুরার অসিলায় পাপী-তাপী মুক্তি পায়, রহমত বর্ষে দুনিয়ায় আশুরার অসিলায়। এমনিভাবে আশুরার দিবসে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর আহলে বাইতের সদস্য সাইয়্যেদেনা হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতের ঘটনা যে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছিল সেটি স্মরণ করে আহলে বাইতের মহব্বতে অশ্রুবিসর্জন দিতে পারলে, এটিও মানবজাতির মুক্তির অসিলা হবে ইনশাল্লাহ।
[লেখক: মোহাম্মদী ইসলামের নেতৃত্ব প্রদানকারী ইমাম; পরিচালক, সমন্বয়ক ও সমস্যার ফয়সালাকারী, দেওয়ানবাগ শরীফ; প্রফেসর, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি]

সম্পর্কিত পোস্ট