শিক্ষা ব্যবস্থায় এলমে তাসাউফ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব উত্থাপন ও সরকারিভাবে বাস্তবায়ন

মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান

শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম একটি বিষয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানবীয় চরিত্র অর্জন করা। চরিত্রবান হওয়ার জন্যেই মানুষকে শিক্ষিত হতে হয়। এজন্যে সমাজে একথা প্রচলিত আছে, আমরা শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের মতো মানুষ হই। শিক্ষার ফলে মানুষ উন্নত জীবনযাপনের মাধ্যমে সমাজ ও দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে। সু-শিক্ষা মানুষকে মহৎ চরিত্রের অধিকারী করে গড়ে তুলবেÑ এটাই কাম্য। তাই ইসলামে মানুষের মানবীয় গুণকে বিকশিত করে উন্নত চরিত্র অর্জনের শিক্ষা গ্রহণের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে হযরত রাসুল (সা.)-এর অনুসৃত শিক্ষা পদ্ধতির উল্লেখ করে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে- “তিনিই (আল্লাহ্) নিরক্ষরদের একজনকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন। যিনি তাদের কাছে আল্লাহ্র আয়াত আবৃত্তি করেন, তাদেরকে উন্নত করেন; শিক্ষা দেন কিতাব ও তত্ত্বজ্ঞান, যারা ইতঃপূর্বে অজ্ঞতার মধ্যে ছিল।” (সূরা জুমা-৬২: আয়াত ২) ক্ষমা ও ধৈর্যশীলতার গুণসম্পন্ন একজন প্রকৃত মুসলমানের উন্নত চরিত্রাদর্শের বর্ণনা দিতে গিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্ তায়ালা

এরশাদ করেন- “ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। ভালো দিয়ে মন্দকে মোকাবিলা করো, ফলে যে তোমার শত্রু- সে হয়ে যায় অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো। এ চরিত্র তাদেরই হয়, যারা ধৈর্যশীল আর এরূপ চরিত্রের অধিকারীই মহাভাগ্যবান” (সূরা হামিম সিজদা-৩২: আয়াত ৩৪-৩৫)।

জ্ঞানের উৎস হিসেবে শিক্ষা ২টি ধারায় বিভক্ত। একটি হচ্ছে এলমে কিতাব বা পুস্তকভিত্তিক শিক্ষা এবং অপরটি হচ্ছে এলমে ক্বালব বা তাসাউফের শিক্ষা। এলমে ক্বালব শিক্ষাদানের মাধ্যমে হযরত রাসুল (সা.) বর্বর যুগের আরবদের উন্নত চরিত্রের অধিকারী করে প্রকৃত মুসলমানে পরিণত করেছেন। এলমে ক্বালব বা তাসাউফের শিক্ষা হৃদয় থেকে হৃদয়ে অর্জিত হয়ে থাকে। এরূপ আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য পুস্তকভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। তাই দেখা যায়Ñ হযরত রাসুল (সা.) সহ পূর্ববর্তী নবি-রাসুলগণ উম্মি বা নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা ছিলেন তাত্ত্বিক জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে জাগতিক বিদ্যায় সু-পণ্ডিত। এরূপ বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের উল্লেখ করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্ তায়ালা ঘোষণা করেন- “তিনি যাকে ইচ্ছা তত্ত্ব জ্ঞান দান করেন, আর যাকে এ জ্ঞান দেওয়া হয় তাকে নিশ্চয়ই প্রচুর কল্যাণ দান করা হয়, আসলে কেবল বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে” (সূরা বাকারা-২; আয়াত ২৬৯)।

সুতরাং এলমে ক্বালব অর্জনের মাধ্যমে মানুষ সত্যের সন্ধান লাভ করে সৎপথ প্রাপ্ত হয়, আর এলমে কিতাবের অনুসারী বাধ্য হয়ে অনুমানের উপর নির্ভর করে বলে সহজে সে সৎপথ থেকে দূরে সরে পড়ে। তাই এলমে কিতাবের উপর এলমে ক্বালবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণায় পবিত্র কালামে এরশাদ হয়েছে-“ওরা কেবল অনুমানের অনুসরণ করে। সত্যের তুলনায় অনুমানের কোনো মূল্য নেই। ওদের জ্ঞানের দৌঁড় পার্থিব বিষয় পর্যন্ত। তোমার প্রতিপালকই ভাল জানেন কে পথভ্রষ্ট আর কে সৎপথ প্রাপ্ত।” (সূরা নজম-৫৩: আয়াত ২৮-৩০)।

এলমে ক্বালব তথা সুফিবাদের শিক্ষা মানবীয় গুণাবলি বিকশিত করার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শে এতখানি উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয় যে, সমগ্র মুসলিম সমাজ এক প্রাণ ও এক দেহতুল্য হয়ে ওঠে। হাদিস শরীফে হযরত রাসুল

(সঃ) বলেন- “সকল মুসলমান একটি দেহতুল্য।” কাজেই মুসলমানগণ একে অপরের সুখে সুখী এবং একের দুঃখে অন্যরাও সম অংশীদার।

তাই দেখা গেছে, মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত রাসুল (সা.) যখন মদীনায় হিজরত করেছিলেন, তখন মক্কার মুসলমানগণ রাসুল (সা.)-এর বিচ্ছেদ যাতনা সহ্য করতে না পেরে নিজেদের ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ এবং স্ত্রী-পরিজন পরিত্যাগ করে তাঁর অনুগামী হয়েছেন। মদীনার মুসলমানগণ মক্কা থেকে আগত সহায় সম্বলহীন এরূপ মুহাজিরগণের দুঃখ-কষ্ট নিজেরা হাসিমুখে ভাগ করে নিয়েছেন। মদীনার আনসারগণ তাদের জায়গা-জমি ঘর-বাড়ি ইত্যাদি মুহাজির ভাইদের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন। এমনকি যার একাধিক স্ত্রী ছিল, তিনি মুহাজির ভাইকে তার পছন্দমত যে কোনো একজনকে ইসলামি বিধি মোতাবেক গ্রহণ করারও সুযোগ করে দিয়েছেন, এমন নজীরও রয়েছে। মানবীয় গুণকে বিকশিত করে মহৎ চরিত্রের অধিকারী করতে সক্ষম এমন জ্ঞান অর্জন করার আবশ্যকতা হযরত রাসুল

(সা.)-এর নিম্নে বর্ণিত হাদিসগুলোতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে: হযরত রাসুল (সা.) বলেন, “তালাবুল ইলমি ফারিদাতুন আলা কুল্লি মুসলিমিও ওয়ালমুসলিমাত।” অর্থ- “প্রত্যেক মুসলিম

নর-নারীর জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরজ।”

অন্যত্র বলা হয়েছে- “উৎলুবুল এলমা ওয়া লাও কানা ফিস সিন।” অর্থাৎ- সুদূর চীন দেশে গিয়ে হলেও তোমরা জ্ঞান অর্জন করো। আলোচ্য হাদিসগুলোতে যে জ্ঞান অর্জন করার কথা বলা হয়েছে, তা হলো এলমে ক্বালব বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান। কেননা, হযরত রাসুল (সা.) নিজে কোনো পুস্তকভিত্তিক জ্ঞান চর্চা করেননি। তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান শিক্ষাদানের মাধ্যমে অন্ধকারে পতিত জাতির মধ্যে মানবীয় গুণের বিকাশ সাধন করেছেন। তিনি নিজে যে কাজটি করেননি তা অনুসারীদের জন্য ফরজ হতে পারে

না। তাই জ্ঞানার্জন বলতে তিনি ক্বালবের মাধ্যমে অর্জিত প্রত্যক্ষ জ্ঞানের কথাই বুঝিয়েছেন। আর চীন দেশে গিয়ে জ্ঞান অর্জন বলতে তিনি উন্নততর দুর্লভ জ্ঞান তথা উত্তম চরিত্রাদর্শ অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহ্র সাথে যোগাযোগের জ্ঞান অর্জনের কথাই বুঝিয়েছেন। পশু প্রবৃত্তির অবসান ঘটিয়ে মানবীয় গুণাবলি বিকাশের জ্ঞান অর্জন করাকে ফরজ বলেছেন। কেননা, তৎকালীন যুগে চীন দেশ আরব অপেক্ষা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক উন্নত ছিল এবং চীনে যাওয়াটাও খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল।

মোট কথা- হযরত রাসুল (সা.)-এর অনুসারী ব্যক্তির জন্যে তিনি যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, সেই ক্বালবী জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। এমনকি পুস্তকভিত্তিক জ্ঞানে যিনি পণ্ডিত, তাকে উন্নততর এ জ্ঞান অনে¦ষণ করতে হবেÑ তা যতই দুর্লভ হোক না কেন। হযরত রাসুল

(সা.)-এর ধর্মাদর্শ শিক্ষাদাতা নায়েবে রাসুল অলী-আল্লাহ্গণ যত দূরবর্তী দেশ বা যত দুর্গম স্থানে থাকুন না কেন, তাঁদের কাছে গিয়ে এ বিদ্যা শিক্ষা করা ফরজ।

পুস্তকভিত্তিক জ্ঞান মানুষকে চরিত্রবান করতে সক্ষম নয়। চরিত্রবান না হয়ে পুস্তকভিত্তিক জ্ঞানে যত বড় পণ্ডিত হোন না কেন তার দ্বারা সমাজের কোনো কল্যাণ সাধিত হবে না। ইসলামসম্মত সু-শিক্ষা মানুষকে তার মানবীয় গুণাবলি বিকশিত করে উন্নত চরিত্রের অধিকারী করার কথা। অথচ আমাদের সমাজের দিকে তাকালে বিপরীত চিত্রই নজরে পড়ে। এর কারণ

অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে চরিত্র গঠনের বিদ্যা ক্রমশ বিদূরিত হচ্ছে। ফলে সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোন আইন বা সামাজিক অনুশাসন এরূপ একটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। যার চরিত্র উত্তম, তার ধর্মও উত্তম। আবার, যে ধর্ম উত্তম তা সঠিকভাবে পালনকারী নিশ্চয়ই উত্তম চরিত্রের অধিকারী।

চরিত্রহীনতা ধর্মহীনতার নামান্তর। চরিত্রহীন ব্যক্তি ধর্মচ্যুত ও পথভ্রষ্ট। যুগে যুগে নবি-রাসুলগণ পথভ্রষ্ট তথা চরিত্রহীন মানুষকে মানবীয় গুণাবলি শিক্ষা দিয়ে সুপথে আনয়ন করেছেন ক্বালবের জ্ঞান বা সুফিবাদ শিক্ষাদানের মাধ্যমে। তাই দুর্নীতি ও মূল্যবোধহীনতার অভিশাপ থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের রক্ষা করে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র সংশোধনের বিদ্যা বা এলমে তাসাউফ অন্তর্ভুক্ত হওয়া খুবই জরুরি। এর ফলে শিক্ষার্থীরা তাসাউফ চর্চার প্রয়োজনীয়তা ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে। এলমে তাসাউফ বাস্তবে অনুশীলনের মাধ্যমে চরিত্র গঠনের জন্যে তারা হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রকৃত আদর্শের ধারক ও বাহক এলমে তাসাউফের

শিক্ষাদাতা অলী-আল্লাহ্গণের শিক্ষা সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ এম.এ. শেষ পর্বের সিলেবাসে ‘আত্ তাসাউফ’ নামে একটি নতুন বিষয় সংযোজন করেছে এবং ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও একই বিভাগে এলমে তাসাউফকে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

১৯৯৫ সালে আমার প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারিভাবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে এল্মে তাসাউফ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষা বছর থেকে কার্যকরী হয়েছে।

চরিত্র গঠনের সহায়ক এ তাসাউফের গুরুত্ব অনুধাবন করত দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ তাদের সিলেবাসে এর অন্তর্ভুক্তির প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়, জাতীয় পাঠ্যক্রম ব্যবস্থার সর্বস্তরে তাসাউফ অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। কেননা, চরিত্রবান হওয়ার জন্যে এলমে তাসাউফের আর কোনো বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে আমার প্রেরিত প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতি, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিবের সাথে সাক্ষাৎ করে এলমে তাসাউফকে জাতীয় পাঠ্যক্রমের

সর্বস্তরে অর্থাৎ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। তাসাউফের জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করত শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় পাঠ্যক্রমের সর্বস্তরে এলমে তাসাউফ অন্তর্ভুক্তকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে তাসাউফের সংজ্ঞা, পরিচিতি, প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা সংযোজিত হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির জন্য এল্মে তাসাউফের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, উত্তম চরিত্র গঠনে তাসাউফের ভূমিকা, তাসাউফের শিক্ষালাভে মোর্শেদের আবশ্যকতা, বিভিন্ন তরিকার উদ্ভব, ইসলাম প্রচারে আউলিয়ায়ে কেরামের অবদান ইত্যাদি বিষয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

[লেখক: স্বত্বাধিকারী, দেওয়ানবাগ শরীফ।]

Digiqole ad

সম্পর্কিত পোস্ট