সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মাঃ আঃ) হুজুর কেবলাজান ।

অলী-আল্লাহ্গণ অমর


মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেবলাজান
[সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান রচিত ‘মুক্তি কোন পথে?’ কিতাব থেকে প্রবন্ধটি সংকলন করা হয়েছে।-সম্পাদক]


মানুষ মরণশীল। মহান আল্লাহ্ বলেন- “কুল্লু নাফসিন যাইক্বাতুল মাউত।” অর্থাৎ- “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সূরা আল আম্বিয়া ২১: আয়াত ৩৫) তবে রূহ বা পরমাত্মা অমর। অর্থাৎ মৃত্যুর পর মানুষের স্থুল দেহ পচে-গলে মাটির সাথে মিশে গেলেও রূহ বা আত্মার বিনাশ ঘটে না। কারণ পৃথিবীতে মানুষ যত বেশি ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হোক না কেন, এর সমস্ত ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের মালিকানা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। তবে অলী-আল্লাহ্গণের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি এবং প্রিয়ভাজন। আল্লাহর সাথে তাঁদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক চিরস্থায়ী।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “আওলিয়াউল্লাহি লা ইয়ামূতূনা ওয়ালাকিন ইয়ানক্বুলূনা মিন দারিন ইলা দার।” অর্থাৎ- আল্লাহর অলীগণ মৃত্যুবরণ করেন না বরং তাঁরা এক ঘর থেকে অন্য ঘরে স্থানান্তরিত হন মাত্র। (তাফসীরে কাবীর- ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৮১)

সেই সাথে সুমহান আল্লাহ্ ওহির বাণী আল কুরআনে এরশাদ করেন- “ওয়ালা তাহসাবান্নাল্লাযীনা কুতিলূ ফী সাবীলিল্লাহি আমওয়াতান, বাল আহইয়াউন ‘ইনদা রাব্বিহিম ইউরঝাকূন।” অর্থাৎ- যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তোমরা কখনো তাদের মৃত ধারণা করো না; বরং তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে জীবিত ও রিজিকপ্রাপ্ত। (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ১৬৯)


মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুুল (সা.)-এর এ বাণী মোবারকে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, ‘অলী-আল্লাহ্গণ অমর’ অর্থাৎ- ওফাত লাভের পরেও আল্লাহর সাথে তাঁদের সুসম্পর্ক পূর্বের ন্যায় বলবৎ থাকে। এমনকি ওফাতের পর উচ্চ পর্যায়ের অলী-আল্লাহ্গণের দেহ মোবারক সাধারণ মানুষের মতো মাটির সাথে মিশে যায় না। যে কারণে ওফাতের পরেও তাঁদের অসিলায় মানুষের মনোবাসনা পূর্ণ হয় এবং তাঁদের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে মানুষ ফায়েজ লাভ করতে পারে।


হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন- “মান ঝারা ক্বাবরী আও ক্বালা মান ঝারানী কুনতু লাহূ শাফী‘আন আও শাহীদা।” অর্থাৎ- যে ব্যক্তি আমার রওজা শরীফ জিয়ারত করবে, অথবা তিনি বলেছেন- যে ব্যক্তি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে, আমি তার জন্য শাফায়াতকারী হবো, অথবা আমি তার জন্য সাক্ষ্যদাতা হবো। (বায়হাকী শরীফ ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৩)
যেহেতু অলী-আল্লাহ্গণ হযরত রাসুলে পাক (সা.)-এর হিদায়েতের নুর তথা সিরাজুম মুনিরের ধারক ও বাহক, তাঁদের দ্বারা অসংখ্য মানুষ মহান আল্লাহ্ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর সন্ধান লাভ করছে। এক কথায় তাঁদের মাধ্যমে হিদায়েতের ধারা অব্যাহত থাকে। এ কারণে বলা হয়, অলী-আল্লাহ্গণ অমর। আর এজন্য পবিত্র কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে- আওলিয়ায়ে কেরাম মৃত্যুবরণ করেন না। অনুরূপভাবে আওলিয়ায়ে কেরামের অমর হওয়ার রহস্য এই যে, আওলিয়ায়ে কেরাম হযরত রাসুল (সা.)-এর হিদায়েতের নুর হৃদয়ে ধারণ করত, তাঁরা তাঁদের অনুসারীদের হযরত রাসুল (সা.)-এর রেখে যাওয়া শান্তির ধর্ম শিক্ষা দেন এবং উত্তম চরিত্র শিক্ষা দিয়ে থাকেন। দেখা যায়, অলী-আল্লাহর ওফাতের পরেও তাঁর অনুসারীদের মাঝে ঐ শিক্ষা বিদ্যমান থাকে। ফলে আশেকে রাসুল মু’মিনদের বংশ পরম্পরায় অলী-আল্লাহর শিক্ষা চলতে থাকে। আর এ শিক্ষা পদ্ধতির ধারাবাহিকতা জারি থাকার মাধ্যমে আল্লাহর অলী-বন্ধুগণ জগদ্বাসীর কাছে অমর হয়ে থাকেন।


এমনিভাবে অলী-আল্লাহ্গণের ওফাতের পরে তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতিসমূহ দেখলে এবং তাঁদের রওজা শরীফ জিয়ারত করলে, ঐ মহামানবের ফায়েজ লাভ করা যায়। এর মাধ্যমেও অশেষ দয়াময় আল্লাহ্ প্রমাণ করেন- তাঁর বন্ধুগণ অমর।


অলী-আল্লাহ্গণ ওফাতের পরেও মানুষের উপকার করেন

আল্লাহর অলীগণ সম্পর্কে হযরত রাসুল (সা.) ফরমান- “আলা ইন্না আওলিয়াআল্লাহি লা ইয়ামূতূনা।” অর্থাৎ-জেনে রেখো, নিশ্চয়ই অলী-আল্লাহ্গণ অমর। এ বাণী মোবারকের মর্ম হচ্ছে- ওফাত লাভের পরেও আল্লাহর সাথে তাঁদের বন্ধুত্ব অটুট থাকে। এজন্য দেখা যায়, ওফাত লাভের পরেও অলী-আল্লাহ্গণ মানুষের উপকার করতে সক্ষম। বিপদে পড়ে মানুষ কোনো অলী-আল্লাহর মাজারে গিয়ে তাঁর অসিলায় আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে বিপদমুক্ত হতে পারে।


অনেকে আবার অলী-আল্লাহর মাজারে মানত করে থাকে, যার বিনিময়ে আল্লাহ্ তার মনোবাসনা পূর্ণ করেন। অলী-আল্লাহর মাজার জিয়ারত অত্যন্ত বরকতপূর্ণ। শুদ্ধ অন্তর নিয়ে এরূপ জিয়ারতের মাধ্যমে অলী-আল্লাহর রূহানি ফায়েজে মানুষের দোয়া কবুল হয় এবং জিয়ারতকারীর আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়। অলী-আল্লাহ্গণ নায়েবে রাসুল হওয়ায় তাঁরাও জগদ্বাসীর জন্য রহমতস্বরূপ। কুল-কায়েনাতের রহমত হযরত রাসুল (সা.) ওফাত লাভের পরেও যেমন মানুষকে উপকার করতে পারেন, তদ্রƒপ অলী-আল্লাহ্গণ হযরত রাসুল (সা.)-এর হিদায়েতের নুর আপন সিনায় ধারণ করার কারণে, তাঁরাও ওফাত লাভের পর মানুষকে উপকার করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আল উতবী (রা.) হতে বর্ণনা হয়েছে। তিনি বলেন- ‘‘আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারকের নিকট বসেছিলাম। তখন একজন বেদুইন আগমন করল, সে হযরত রাসুল (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলল- আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আমি শুনেছি, আল্লাহ্ তায়ালা ঘোষণা করেছেন- ‘যদি তারা নিজেদের উপর জুলুম করার পর আপনার কাছে আসত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত, আর রাসুল (সা.)-ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তবে নিশ্চয় তারা আল্লাহ্কে তওবা কবুলকারী এবং পরম দয়াময় হিসেবে পেতো।’ [হে আল্লাহর রাসুল (সা.)!] আমি আমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং আমার প্রতিপালকের নিকট আমার জন্য আপনার শাফায়াত পাওয়ার আশায় আগমন করেছি, এ বলে বেদুইন লোকটি প্রস্থান করল। এ সময় আমার চোখে নিদ্রা এসে গেলো। আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর দিদার পেলাম, তিনি আমাকে বললেন- হে উতবী! তুমি বেদুইন লোকটির সাথে সাক্ষাৎ করো এবং তাকে সুসংবাদ দাও যে, আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।’’ (তাফসীরে ইবনে কাছীর- ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬৯ ও ৭৭০)


এরই ধারাবাহিকতায় নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগে অলী-আল্লাহ্গণও ওফাতের পরে মানুষের উপকার সাধন করে থাকেন। অলী-আল্লাহ্গণের মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বলেন- “আলা ইন্না আওলিয়াআল্লাহি লা খাওফুন ‘আলাইহিম ওয়ালাহুম ইয়াহঝানূন। অর্থাৎ ‘‘জেনে রেখো! আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা দুঃখিতও হবে না।’’ (সূরা ইউনুস ১০: আয়াত ৬২)
প্রকৃতপক্ষে তাঁরা আল্লাহর বন্ধু বলেই আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় বন্ধুর খাতিরে মানুষের জন্য রহমত প্রদান করেন।
[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, দেওয়ানবাগ শরীফ]

Digiqole ad

সম্পর্কিত পোস্ট