সম্পাদকীয়


হযরত রাসুল (সা.) বলেন, ‘‘ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৫টি বিষয়ের ওপর- ১। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল- এ কথায় সাক্ষ্য দান করা; ২। নামাজ কায়েম করা; ৩। জাকাত দেওয়া; ৪। হজ করা এবং ৫। রমজানের রোজা পালন করা।’’ (বোখারি শরীফ) সুতরাং পবিত্র হজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং ৫ম স্তম্ভ। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) সাড়ে ৪ হাজার বছর পূর্বে মহান আল্লাহর নির্দেশে সর্বপ্রথম হজের প্রবর্তন করেন। হজ প্রবর্তনের আগে তিনি আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশে স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে সাথে নিয়ে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য যে, কালের বিবর্তনে হযরত আদম (আ.) কর্তৃক নির্মিত কাবাঘরটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কাবাঘর নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন হলে মহান আল্লাহ্ তাঁর বন্ধু হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে হজব্রত পালনের নির্দেশ প্রদান করেন। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘‘যখন আমি ইব্রাহিমকে কাবাগৃহের স্থান নির্ধারণ করে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কোনো কিছু শরিক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রেখ তাওয়াফকারীদের জন্য, নামাজে দণ্ডায়মান লোকদের জন্য, রুকুকারী ও সিজদাকারীদের জন্য এবং মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা করে দাও।” (সূরা হাজ্জ ২২: আয়াত ২৬ ও ২৭)

মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) মাকামে ইব্রাহিমে দাঁড়িয়ে হজের ঘোষণা করেন, “হে লোক সকল! আল্লাহর নির্দেশে তাঁর গৃহ নির্মিত হয়েছে এবং তিনি তোমাদের উপর এ গৃহে হজ ফরজ করেছেন, তোমরা সবাই আল্লাহর আদেশ পালন করো।” এভাবেই পবিত্র মক্কা নগরী হজব্রত পালনের ক্ষেত্র হিসেবে পরিণত হয়।


আরবি ‘হাজ্জুন’ শব্দ থেকে হজ শব্দের উৎপত্তি, এর আভিধানিক অর্থ হলো সংকল্পবদ্ধ হওয়া। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ইহরামের সাথে জিলহজ মাসের ৯ তারিখে কতগুলো নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদনপূর্বক কাবা শরীফ জিয়ারত করে আরাফার ময়দানে সমবেত হয়ে ইসলামি জীবন বিধান অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করার সংকল্প গ্রহণ করাকে হজ বলা হয়। রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুল (সা.) হিজরি দশম বর্ষে হজ পালন করেন। হজ সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য ফরজ বা অবশ্য পালনীয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন, “মানুষের মধ্যে তার উপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ, যার যেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে।” (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৯৭) মূলত মক্কা মুয়াজ্জামায় গিয়ে হজ পালন করার মতো যার শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তার জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ করা ফরজ।


প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ প্রেরিত মহামানবগণের অনুসরণ করার শিক্ষা নিজ হৃদয়ে ধারণের জন্য হজ পালন করতে হয়। তাই আজও মহামানবগণের অনুসরণে বিশ্বের মুসলমানগণ হজ পালন করে থাকেন। হাজরে আসোয়াদ বা কালো পাথরে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কদম মোবারকের স্পর্শ লেগেছিল। তাঁর সম্মানে হাজিরা আজও গুনাহ মাফের আশায় উক্ত পাথরে চুম্বন করে থাকেন। হযরত মা হাজেরা (আ.) স্বীয় পুত্রের জন্য পানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়েছিলেন। হাজিরা তাঁকে অনুসরণ করে সাফা-মারওয়া দৌড়িয়ে থাকেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) কাবাঘর নির্মাণ করে নিজে সেখানে অবস্থান করতেন। তাঁর প্রতি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশ করে হাজিরা আজও কাবাঘরকে ৭ বার তাওয়াফ করে থাকেন। হযরত রাসুল (সা.) জাবালে রহমতে দাঁড়িয়ে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশে বিদায় হজের খুৎবা প্রদান করেছিলেন, এখনও হাজিরা তাঁকে অনুসরণের জন্য আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। তাঁর অনুসরণে আজও হাজিরা মিনায় গিয়ে কোরবানি করে থাকেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হজের মাধ্যমে মহামানবগণের অনুকরণ ও অনুসরণের শিক্ষাই আল্লাহ্ তায়ালা মানবজাতিকে দিয়ে থাকেন।


উল্লেখ্য যে, যাদের হজে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের হজ প্রসঙ্গে হযরত জালালউদ্দিন রুমী (রহ.) বলেছেন, “দিলবদস্তে আরকে হজে আকবারাস্ত, ছদ্হাজারা কাবা একদিল বেহেতরাস্ত। অর্থাৎ- তুমি যদি আল্লাহর বন্ধুকে ভালোবাসতে পারো আকবরি হজের চেয়ে উত্তম ও বেশি ফলদায়ক হবে।” তিনি আরও বলেন, লক্ষ কাবার চেয়ে আল্লাহ্কে ধারণকারী একটি পুতঃপবিত্র হৃদয়ের মর্তবা অনেক বেশি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- “এ কাবা বেনায়ে আবো গেলাস্ত; আকাবা বেনায়ে আজ নুরে খোদাস্ত।” অর্থাৎ- কাবাঘরকে পানি, পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আর মু’মিন ব্যক্তির দিল কাবাকে আল্লাহর খাছ নুর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এ কাবা গুজারগাহে খালিলাস্ত- আকাবা গুজারগাহে রাব্বে জলিলাস্ত।” এ কাবায় হযরত ইব্রাহিম (আ.) বসবাস করতেন, আর মু’মিন ব্যক্তির দিল কাবাতে আল্লাহ্ নিজে বাস করেন। এ প্রসঙ্গে হযরত রাসুল (সা.) বলেন, “মু’মিন ব্যক্তির দিল আল্লাহর আরশ।” তিনি আরো বলেন, “আল্লাহর নিকট মু’মিনের মর্যাদা তোমার (কাবার) মর্যাদার চেয়েও অনেক বেশি। (সুনানে ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা ২৮২)


এই প্রসঙ্গে মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) বলেন, “মু’মিন ব্যক্তির মাঝে আল্লাহ্ তায়ালা বসবাস করেন বিধায় তাঁকে শ্রদ্ধা করার অর্থ হলো আল্লাহ্কে শ্রদ্ধা করা; তাঁর নির্দেশ মতো চলার অর্থই হলো আল্লাহর নির্দেশে চলা।” (সূফী সম্রাটের যুগান্তকারী ধর্মীয় সংস্কার, তৃতীয় পুনঃমুদ্রণ, পৃষ্ঠা ৪৮)

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (সূরা নিসা ৪: আয়াত ৮০) আর বেলায়েতের যুগে আমাদেরকে হযরত রাসুল (সা.)-এর সিরাজুম মুনিরের ধারক ও বাহক যুগের ইমামের অনুসরণ করতে হবে। এটিই হেদায়েতের চিরন্তন ধারা বা নিয়ম।
এবার আসা যাক পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ প্রসঙ্গে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “[হে রাসুল (সা.)!] আপনি বলুন নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহর জন্য।” (সূরা আল আন‘আম ৬: আয়াত ১৬২) কিন্তু আমাদের দেশে নিজের নামে, পিতার নামে, এমনিভাবে ৭ নামে কোরবানি দেওয়ার প্রচলন ছিল। আমার মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেবলাজান ভ্রান্ত ধারণাটি সংশোধন করে বললেন, “কোরবানি বান্দার নামে নয়, বরং বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে দিতে হয়।” কেননা হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসুল (সা.) কোরবানি দেওয়ার সময় এভাবে নিয়ত বলতেন- “হে আল্লাহ্! আপনি আমার পক্ষ থেকে, আমার পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানি কবুল করুন।” জগৎশ্রেষ্ঠ এ মহামানবের আহ্বানে আপামর মুসলমানগণ পবিত্র কুরআন ও হাদিসের শিক্ষানুসারে বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে কোরবানি দিয়ে নিজেদেরকে র্শিক করা থেকে বিরত রখার সুযোগ পাচ্ছেন। হাকিকতে কোরবানি প্রসঙ্গে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান বলেন, “কোরবানির মূখ্য উদ্দেশ্য হলো নিজের ভিতরের পশুত্ব তথা নফসের কুপ্রবৃত্তিকে বিসর্জন দেওয়া এবং আল্লাহর ইচ্ছায় জীবন যাপনে সচেষ্ট হওয়া।”
পরিশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা-তিনি আমাদের সকলকে তাঁর মহান বন্ধু সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের শিক্ষা মোতাবেক হাকিকতে হজ পালন ও কোরবানি করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Digiqole ad

সম্পর্কিত পোস্ট