সম্পাদকীয়

 সম্পাদকীয়

বাঙালির জাতীয় জীবনে ফেব্রুয়ারি মাস অত্যন্ত তাৎপর্যমন্ডিত ও স্মৃতিবহ একটি মাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর প্রমুখ বাংলা ভাষাপ্রেমীর আত্মদানের মধ্য দিয়ে বাংলাভাষা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতি পায়। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। এর ফলে পূর্ব বাংলার জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদ কর্মসূচি ও ধর্মঘটের আহ্বান করে। পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়। আন্দোলন দমন করতে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রশ্নে পুরাতন কলাভবন প্রাঙ্গণের আমতলায় ঐতিহাসিক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্ররা পাঁচ সাতজন করে ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে চায়। তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। পুলিশ অস্ত্র হাতে সভাস্থলের চারদিক ঘিরে রাখে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে ছাত্ররা একত্র হয়ে প্রতিবন্ধকতা ভেঙে রাস্তায় নামার প্রস্তুতি নিলে পুলিশ কাঁদানো গ্যাস নিক্ষেপ করে ছাত্রদের সর্তক করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তখন পুলিশকে কাঁদানো গ্যাস নিক্ষেপ বন্ধ করতে অনুরোধ জানান এবং ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন। কিন্তু ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময়ে কয়েকজন ছাত্রকে ১৪৪ ধারা ভঙের অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আরো অনেক ছাত্র গ্রেফতার হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের উপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ আরো অনেকে। ভাষা শহিদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। শোকাবহ এ ঘটনায় পূর্ব বাংলায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মাতৃভাষার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে ভাষা শহিদরা বাঙালি প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে অমর ও অক্ষয় হয়ে আছে। ভাষা শহিদদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাদের আত্মত্যাগের কারণে আজ আমরা মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলতে পারছি।


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রধান তাৎপর্য এই যে, এর মাধ্যমে বাঙালি জাতি তার জাতীয়তা বোধ ও অধিকার সম্পর্কে প্রথম সচেতন হয়। ভাষার প্রশ্নে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এর ফলে পূর্ব বাংলায় গড়ে ওঠে একটি সচেতন শ্রেণি। এরপর যত আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে এর পেছনে উদ্বুদ্ধ করেছে ভাষা আন্দোলনের উজ্জ্বল স্মৃতি। ভাষা আন্দোলনের প্রেরণায় ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয়দফা এবং ১৯৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয় অর্জিত হয়েছে। আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয় এই যে, ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন, যা বাংলাদেশ-সহ সারা বিশ্বে গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উদ্যাপিত হয়। বাংলা ভাষা বিশ্বে আজ বিশেষ মর্যাদার স্থান করে নিয়েছে। বাংলা ভাষায় কথা বলে প্রায় ত্রিশ কোটি মানুষ। এর মধ্যে বাংলাদেশের ষোলো কোটি এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দশ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। এছাড়া ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশাসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশে প্রায় তিন কোটি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আরো প্রায় এক কোটি বাংলাভাষী মানুষ রয়েছে। মাতৃভাষী মোট জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলা পৃথিবীর ৬ষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ভাষা।


ভাষা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তাকে শিখিয়েছেন কথা বলতে (ভাষা শিখিয়েছেন)।” (সূরা আর রহমান ৫৫: আয়াত ৩-৪) পৃথিবীতে যেমন নানাদেশ রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানাজাতি, গোত্র, বর্ণ, ধর্ম ও ভাষা। একই ভাষাভাষী মানুষের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণভঙ্গী পৃথক। এটি মহান আল্লাহর এক অপূর্ব নিদর্শন। এই প্রসঙ্গে মহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে রয়েছে বহু নিদর্শন জ্ঞানবানদের জন্য।” (সূরা আর রূম ৩০: আয়াত ২২) মহান আল্লাহ্ মানুষকে হেদায়েতের জন্য যতগুলো আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন, সেগুলো প্রত্যেক রাসুলের ক্বালবে নিজ নিজ কওমের ভাষায় নাজিল করেছেন। এর মধ্যে প্রধান ৪টি আসমানি কিতাব যথাক্রমে হযরত মুসা (আ.)-এর নিকট তাওরাত হিব্রু বা ইবরানি ভাষায়, হযরত ঈসা (আ.)-এর নিকট ইনজিল সুরিয়ানি ভাষায়, হযরত দাউদ (আ.)-এর নিকট জাবুর ইউনানি বা আরমাইক ভাষায় এবং মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হয় হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর নিকট আরবি ভাষায়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “আমি সব রাসুলকে তাঁদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই পাঠিয়েছি, যেন সে (আমার বাণী) তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করতে পারে।” (সূরা ইব্রাহীম ১৪: আয়াত ৪) হযরত রাসুল (সা.) আরবি ভাষাভাষী হওয়ায় মহাগ্রন্থ আল কুরআন আরবি ভাষায় নাজিল হয়েছে। এই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ আরবদের লক্ষ্য করে বলেন, “আমি কুরআনকে আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করেছি, যেন তোমরা সহজে তা বুঝতে পারো।” (সূরা ইউনুস ১২: আয়াত ২) প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পৃথিবীতে যত ভাষা রয়েছে সকল ভাষাই আল্লাহর।


ভাষার বোধগম্য বিষয়টি বিবেচনা করে আমার মহান মোর্শেদ মহান সংস্কারক সুফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেব্লাজান সর্বপ্রথম মাতৃভাষায় জুমার নামাজের খুৎবা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং মাতৃভাষায় জুমার খুৎবা প্রদানের সংস্কার করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নানা পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের কর্তব্য ও করণীয় বিষয়ক প্রয়োজনীয় সময়োপযোগী উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্যে শুক্রবার জুমার নামাজে খুৎবার বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে খুৎবা প্রদান আরবি ভাষায় হওয়ায় মুসল্লিগণ খুৎবার বিষয়বস্তু বুঝতে পারে না। ফলে আমল করে তা থেকে উপকৃত হতে পারেন না।” সূফী সম্রাট হুজুর কেব্লাজানের যৌক্তিক প্রস্তাবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষায় খুৎবা প্রদানের রীতি চালু হয়েছে।

অত্যন্ত আনন্দের বিষয় এই যে, ২০২০ সাল থেকে সৌদি আরবে হজের দিন খতিব সাহেব যে খুৎবা প্রদান করেন, তা বাংলা ভাষাসহ ১০টি ভাষায় সাথে সাথে অনুবাদ হয়ে হাজিদের শুনানো হয়। যার ফলে হজ করতে যাওয়া বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ভাষার হাজিদের হজের নিয়মাবলি এবং খুৎবার বিষয়বস্তু বুঝতে সহজ হয়। সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী হুজুর কেব্লাজানের সংস্কার হজের খুৎবার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে, এজন্য জগৎশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের কদম মোবারকে জানাই লাখো শোকরিয়া। আমিন।