Cancel Preloader

প্রখ্যাত সুফিসাধক হযরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রহ.)


ড. সৈয়দ মেহেদী হাসান
পর্ব-০১
হযরত খাজা সৈয়দ মোহাম্মদ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রহ.) ছিলেন একজন প্রখ্যাত সুফি সাধক। তিনি তৎকালীন দেশরক্ষক অলী-আল্লাহ্গণের প্রধান কুতুবুল আকতাবের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি সাধনার পথে কঠোর পরিশ্রম ও রিয়াজতকারীদের অন্যতম এবং সুফি সাধনায় এক গৌরবোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তিনি এই উপমহাদেশের বিখ্যাত সুফি গরিবে নেওয়াজ হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর প্রধান খলিফা ছিলেন। তাছাড়া বিখ্যাত সুফি হযরত ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকর (রহ.)-এর মোর্শেদ ছিলেন তিনি। হযরত বখতিয়ার কাকি (রহ.)-এর নামেই দিল্লির বিখ্যাত ‘কুতুব মিনার’ নামকরণ করা হয়। হযরত বখতিয়ার কাকি (রহ.) মুরিদ হওয়ার পূর্বে চিশতিয়া তরিকা শুধুমাত্র আজমির এবং নাগাউর অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। ভারতে সুফিবাদ প্রচারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। তিনি সুফিবাদ দর্শন প্রচারে সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও মানবতাবাদী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিলেন। তখন ভারতে ইসলামের একটি নতুন মাত্রা উন্মোচিত হতে শুরু করে, যা এর পূর্বে ছিল না। তিনি ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ভারতে বহু লোককে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিলেন। হিন্দু, খ্রিষ্টান, শিখ-সহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ প্রতি দিন তাঁর রওজা জিয়ারতে আসেন।
উপাধি
হযরত কুতুবুদ্দিন কাকি (রহ.)-এর আসল নাম বখতিয়ার; কুতুবুদ্দিন তাঁর উপাধি। তাছাড়া কাকি, কুতুবুল আকতাব, মালিকুল মাশায়েখ, রাইসুস সালেকিন ও সিরাজুল আউলিয়া নামে পরিচিত ছিলেন।
শুভ জন্ম
তিনি ছিলেন ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (রা.)-এর বংশধর। হযরত কুতুবুদ্দিন কাকি (রহ.) বর্তমান কিরগিজিস্তানের আউস পূর্বে ইরাক নামক স্থানে ১১৭৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত সৈয়দ কামাল উদ্দিন (রহ.) এবং মাতার নাম হযরত মাজিদা (রহ.)। ‘সিয়ারুল আকতাব’-এর বর্ণনানুসারে জানা যায়, রাত্রের মধ্যভাগে শিশু কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রহ.) এই নশ্বর পৃথিবীতে তাশরিফ আনেন। তাঁর জন্মের সময় সমগ্র ঘরে আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ে। ঐ আলোকরশ্মির আলোয় ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছিল। তাঁর মহীয়সী মাতাকে অদৃশ্য জগত থেকে একটি আওয়াজ শোনানো হয়- “এই নুর (আলো), যা তুমি দেখেছ আল্লাহ্র রহস্যাদি থেকে একটি গুরু রহস্য, যাকে আমি তোমার এই সন্তানের বক্ষে স্থানান্তরিত করলাম।”
‘বিস্মিল্লাহ্ খানি’ অনুষ্ঠান
হযরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রহ.)-এর পিতা তাঁর দুই বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মাতা অত্যন্ত পরিশ্রম ও যতœ সহকারে তাঁকে লালনপালন করেন। যখন তাঁর বয়স ৪ বছর ৪ মাস ৪ দিন হয়, তখনকার নিয়মানুসারে তাঁর মাতা তাঁর ‘বিস্মিল্লাহ্ খানি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ঘটনাচক্রে তখন গরিবে নেওয়াজ হযরত খাজা মুঈনুদ্দ্নি চিশতি (রহ.) ভ্রমণ করে আউসে তাশরিফ নেন। তিনি সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। তাঁর মাতা একে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে আপন কলিজার টুকরা শিশু সন্তানকে ‘বিসমিল্লাহ্ খানি’-এর জন্য খাজা গরিবে নেওয়াজের হুজরে পাঠান। খাজা যখনই শিশু বখতিয়ার কাকির ‘তখ্তি’ (ফলক) লিখার ইচ্ছা করলেন, তখন অদৃশ্য থেকে আওয়াজ আসলো- ‘‘হে খাজা! লিখন স্থগিত করুন! কাজী হামিদ উদ্দীন তাশরিফ আনবেন। তিনি তখন (ফলক) লিখনের কাজ সমাধা করবেন।’’ ইতোমধ্যে কাজী সাহেব তাশরিফ আনেন। তিনি ফলকগুলো নিজের নিকট নিলেন। শিশু কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকিকে জিজ্ঞেস করলেন-কী লিখবো? তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পঞ্চদশ পারার আয়াত পড়ে বললেন, ‘‘এটা লিখুন!’’ কাজী সাহেব বললেন, ‘‘সাহেবজাদা! এ আয়াত আপনাকে কে মুখস্ত করিয়েছেন?’’ তিনি বললেন, ‘‘আমার মহীয়সী মাতা পনের পারার হাফেজ, আমাকে গর্ভে ধারণকালে যখন তিনি তিলাওয়াত করতেন, তখন আমি শুনতাম। এমনকি আমিও পনের পারার হাফেজ হয়ে গিয়েছি।’’ এরপর কাজী সাহেব মাত্র ৪ দিনে শিশু কুতুবুদ্দিন বখতিয়ারকে পূর্ণ কুরআন শরীফ হিফজ করিয়ে দেন।
শিক্ষা জীবন
হযরত খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রহ.)-এর বয়স যখন পাঁচ বছর হয়, তখন তাঁর মহীয়সী মা এক বুজুর্গ প্রতিবেশীকে তার নিষ্পাপ সন্তানকে একজন ভালো শিক্ষকের কাছে অর্পণ করতে বলেন, যাতে সে ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। একথা শুনে বুজুর্গ ব্যক্তি বলেন, “এই কাজটি আমার উপর ছেড়ে দিন। আমি একে এমন একজন শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর করব যার জ্ঞান এবং আশীর্বাদ তাকে পূর্ণতার মহান গুরুতে পরিণত করবে।” বুজুর্গ লোকটি আউস শহরের একজন শিক্ষক হযরত আবু হাফসের কাছে গিয়ে খাজা কুতুবকে তার হাতে তুলে দেন। সেই সাথে তিনি হযরত আবু হাফসকে নির্দেশ দিলেন যে, এই ছেলেটি অলীদের মধ্যে গণ্য হবে, তাই তার প্রতি বিশেষ মমতা করুন। মাওলানাকে তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘‘পূর্ণ মনোযোগ সহকারে তাঁকে পড়াবেন। কারণ তাঁর দ্বারা বড়ো বড়ো কাজ সমাধা করা হবে।’’ মাওলানা আবু হাফস হযরত বখতিয়ার কাকি (রহ.)-কে জাহেরি ও বাতেনি এলমে পূর্ণ জ্ঞান দান করেন এবং তরিকতের সাধনার পথে নিয়ম পদ্ধতি উত্তমরূপে শিক্ষা দেন। হযরত বখতিয়ার কাকি (রহ.)-এর শিক্ষা পরিপূর্ণ হলে তিনি আল্লাহ্কে পাওয়ার পথ প্রদর্শক তথা মোর্শেদকে পাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। পরবর্তীতে কোনো এক শহরে হযরত খিজির (আ.)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ওখান থেকে হযরত বখতিয়ার কাকি (রহ.) আরো এগিয়ে গেলেন। সেখানে হযরত মাহমুদ ইস্পাহানি (রহ.) নামের এক সুফি বুজুর্গের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি তাঁর হাতে বায়াত হতে চাইলেন; কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালার ইচ্ছা ছিল অন্য। ওই দিনগুলোতে হযরত বখতিয়ার কাকি (রহ.) জানতে পারেন যে, হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) ইস্পাহান তাশরিফ এনেছেন। তিনি কাল বিলম্ব না করে সেখানে তাঁর দরবারে হাজির হন। হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) তখন চাদর মুড়ি দিয়ে শয়নরত ছিলেন। তিনি উঠে চাদর মোবারকটি হযরত বখতিয়ার কাকি (রহ.)-এর মাথায় ও গায়ে মুড়িয়ে দেন। এটার হাকিকত হলো, হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) তাঁকে বায়াত করান অর্থাৎ মুরিদ হিসেবে গ্রহণ করে নেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর কাছে বায়াত হওয়ার পর হযরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রহ.)-এর অন্তরে আপন মোর্শেদের প্রতি এমন অকৃত্রিম গভীর ভালোবাসা পয়দা হয়, সফরে এবং বাড়িতে এক মুহূর্তের জন্যও মোর্শেদের বিচ্ছেদ সহ্য হতো না। এজন্য তিনি আপন মোর্শেদের সহবতে থাকতে লাগলেন।
(চলবে)
তথ্যসূত্র:
১। তায্কেরাতুল আওলিয়া ৪র্থ খণ্ড, মাওলানা নূরুর রহমান, এমদাদিয়া পুস্তকালয় (প্রা.) লি. ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৫৬-১৭০
২| https://bn.wikipedia.org/wiki

৩| https://www.abswer.com/2022/04/biography-of-qutbuddin-bakhtiyar-kaki.html

৪| https://en.wikipedia.org/wiki/Qutbuddin_Bakhtiar_Kaki


[লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক]

সম্পর্কিত পোস্ট