Cancel Preloader

মাহে রবিউল আউয়াল: ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.)

সাব্বির আহমাদ ওসমানী
হিজরি সনের তৃতীয় মাস হলো রবিউল আউয়াল। রাব থেকে রবি, যার অর্থ বসন্তকাল। ‘আউয়াল’ মানে প্রথম রবিউল আউয়াল মানে হলো প্রথম বসন্ত বা বসন্তকালের প্রথম মাস। প্রিয় নবিজি (সা.)-এর বহুমাত্রিক স্মৃতিধন্য এই মাস মানব সভ্যতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। মুসলিম মানসে এই মাস শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও মহিমায় পরিপূর্ণ। মহানবি হযরত মোহাম্মদ (সা.) ১২ই রবিউল আউয়াল দুনিয়াতে শুভাগমন করেন। রিসালাতের মহামিশনের সফলতা ও পরিপূর্ণতার অতীব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, ইসলামি রাষ্ট্র তথা সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার সূচনা করেন তিনি। এই মাসের ১লা রবিউল আউয়াল তারিখেই আখেরি নবির তিরোধান বা ওফাত হয়েছিল।


রবিউল আউয়াল মাসটি মুসলিম সমাজে নবি করিম (সা.)-এর জন্মেরও স্মারক হিসেবে পালিত হয়। যা ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম নামে পরিচিত। ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম কথাটি ফারসি ভাষা থেকে আগত। দোয়াজদাহম মানে ১২ অর্থাৎ ১২ তারিখের ফাতিহা অনুষ্ঠান। কালক্রমে দিনটি মিলাদুন্নবি (সা.) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এর অর্থ হলো প্রিয় নবি (সা.)-এর জন্মদিনের অনুষ্ঠান। ধীরে ধীরে এর সঙ্গে ঈদ শব্দ যোগ হয়ে ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.) রূপ লাভ করে। যার অর্থ হলো হযরত রাসুল (সা.)-এর জন্মোৎসব। হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম তারিখ নিয়ে সিরাত গ্রন্থ, জীবনীকার, ওলামায়ে কেরাম ও ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে বিস্তর মত পার্থক্য রয়েছে। তবে প্রায় সবাই এ বিষয়ে একমত যে তাঁর জন্ম হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার প্রত্যুষে বা ভোরবেলায় তথা উষালগ্নে। সেদিন ছিল ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল। আর তিনি ইহলোক থেকে চিরবিদায় নেন রবিউল আউয়াল মাসের ১ তারিখ সোমবার অপরাহ্নে বা গোাধলিলগ্নে।


তবে বিভিন্ন চক্রান্তে তাঁর বেলাদাত ও ওফাত ১২ই রবিউল আউয়াল হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে মুসলিম সমাজে বিশ্বব্যাপী। এর পিছনে একটি নিগূঢ় রহস্য বা কারণ লুকিয়ে আছে যা অনেকেরই অজানা। তবে সাধনালব্ধ জ্ঞান, পবিত্র কুরআন ও হাদিসের দলিল দিয়ে এ ভুল সংখ্যাটি ভুল প্রমাণ করে সঠিক তারিখটি জাতির কাছে তুলে ধরেন যুগের মোজাদ্দেদ সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্Ÿুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেব্লাজান। তিনি বলেন, “হযরত রাসুল (সা.) মাত্র ২৩ বছরে একটি বর্বর, অসভ্য ও অনুন্নত জাতিকে সুসভ্য ও সমৃদ্ধশালী করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের ওফাতের তারিখ নিয়ে আজ আমরা তাঁর অনুসারীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও জীবনীকার হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাতের তারিখকে ভিন্ন ভিন্ন বলে মন্তব্য করেছেন। যিনি তাঁর সুশিক্ষিত কাতেবদের দিয়ে আল্লাহ্র বাণী আল কুরআনের প্রতিটি আয়াত নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করে গেছেন, যিনি অগণিত সত্যাশ্রয়ী নিবেদিত মানুষ তৈরী করে একটি সুশৃঙ্খল আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। যিনি অসংখ্য নিরক্ষর মানুষকে শিক্ষার আলো দিয়ে কুরআন হাদিসের বিশেষজ্ঞ করে গেছেন। তাঁর ওফাতের সঠিক তারিখটি লিখে রাখার মতো কি কোনো হৃদয়বান সাহাবি ছিলেন না? তাঁর জন্মের তারিখটি ভুল হলে মনকে বুঝানো যেত কারণ হযরত রাসুল (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন তখন তাঁর কাছে উল্লেখযোগ্য কেউ ছিল না। জন্মের তারিখটি লেখার গুরুত্ব কেউ বুঝতে পারেনি, কারণ উনি যে ভবিষ্যতে রহমতের নবি হবেন কেউ বুঝতে পারেনি, তাই জন্মের তারিখটি লেখা হয়নি। পরবর্তীতে লিখতে গিয়ে ভুল হয়েছে। কারণ তখন তাঁর কাছে কোনো কাতেবে ওহি ছিল না। কিন্তু ওফাতের তারিখের বিষয়টিতো এমন নয়। সম্পূর্ণ বিপরীত। জন্মের তারিখটি ভুল হলে মেনে নেওয়া যেতো। জন্মের দিন তারিখটি ভুল হলো না-সকল ঐতিহাসিকগণই একমত যে হযরত রাসুল (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার সুবহে সাদিকের পর জন্ম গ্রহণ করেছেন।”


তাহলে ওফাতের তারিখটি নিয়ে মুসলিম সমাজে কেন এত ধুম্রজাল? আসুন আমরা এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে চেষ্টা করি। হযরত রাসুল (সা.) ৬৩ বছর বয়সে দিবালোকে সকলের সমানে কথা বলতে বলতে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। তিনি তো কোথাও যুদ্ধ করতে গিয়ে গুম হয়ে যাননি, অথবা লোকচক্ষুর অন্তরালে গিয়ে ইন্তেকাল করেননি। তিনি হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.), হযরত ওমর (রা.), হযরত ওসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), হযরত তালহা (রা.), হযরত যুবায়ের (রা.), হযরত আবুজর গিফারি (রা.), হযরত সালমান ফারসি (রা.)-এর মতো অসংখ্য বিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী বরেণ্য সাহাবায়ে কেরামের সামনে হাসিমুখে ওফাত লাভ করেছিলেন। কিন্তু তারা কি কেউ এ হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাতের তারিখটি লিখে রাখতে পারেননি? বিবেকের কাছে জিজ্ঞেস করলে এর কোনো সুদত্তর পাওয়া যায় না। শুধু একটি কথাই মনে হয়, নিশ্চয়ই আমরা কোনো চক্রান্তের শিকার হয়ে আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসুল (সা.)-এর ওফাতের তারিখটি হারিয়ে ফেলে আজ চরম বিভ্রান্তিতে হাবুডুবু খাচ্ছি। কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে, সত্য চিরদিনই সত্য। মিথ্যা দিয়ে সত্যকে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা যায় বটে, চিরদিন তাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। আসুন আমরা বিভিন্ন তাফসির ও হাদিস শরীফের বর্ণনা বিশ্লেষণ করে হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাতের সঠিক তারিখটি তথ্যগতভাবে নির্ণয় করার চেষ্টা করি। সূরা মায়েদার ৩নং আয়াতে মহান আল্লাহ্ বলেন, “আজ আমি তোমাদের ধর্মকে পূর্ণত্ব প্রদান করলাম, আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে একমাত্র ধর্ম হিসাবে কবুল করে নিলাম।”


এ প্রসিদ্ধ আয়াতখানি হিজরি ১০ম বর্ষের ৯ই জিলহজ তারিখে আরাফার ময়দানে অবর্তীর্ণ হয়। এ আয়াত নাজিল হওয়ার স্থান, দিন, তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট হওয়ায় এ তারিখকে হযরত রাসুল (সা)-এর ওফাতের তারিখ নির্ণয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা যায়। বিখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- “এ আয়াত দশম হিজরির ৯ই জিলহজ তারিখে নাজিল হয়। এরপর হযরত রাসুল (সা.) মাত্র ৮১ দিন পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন।” (তাফসীর মা’রেফুল কুরআন)


বিদায় হজের দিনে আলোচ্য আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়া থেকে ৮১তম দিবসে হযরত রাসুল (সা.) ওফাত লাভ করেন বলে সর্বসম্মত অভিমত। প্রাচীন ও আধুনিককালের প্রায় ভাষ্যকারই এ মত ব্যক্ত করেছেন। বর্তমানকালে আল্লামা সাব্বীর আহমদ ওসমানীও তার বিখ্যাত উর্দু তাফসীরে ৮১ম দিন উল্লেখ করেছেন। তাফসীরে দুররে মানছুরের ৬ষ্ঠ খণ্ড ২০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- ইবনে জারীর কর্তৃক ইবনে জুরাইজ হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, “এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) ৮১ রাত দুনিয়াতে অবস্থান করেন।”
তাফসীরে তাবারীর ৬ষ্ঠ খণ্ড ৮০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- হাজ্জাজ কর্তৃক ইবনে জুরাইজ হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- “এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর ৮১ রাত হযরত রাসুল (সা.) জীবিত ছিলেন।”
ইমাম বাগবী বলেন- হারুন ইবনে আনতারা তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, “এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত রাসুল (সা.) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।” (তাফসীরে মাজহারী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪)


ইবনে জারীর ও অন্যরা বলেন- “আরাফার দিবসের পর হযরত রাসুল (সা.) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।” (তাফসীরে ইবনে কাছীর, ২য় খণ্ড পৃষ্ঠা ২১)
অত্র বর্ণনাগুলো থেকে বিষয়টি সুষ্পষ্ট যে, হযরত রাসুল (সা.) বিদায় হজের দিন থেকে ৮১তম দিবসে ওফাত লাভ করেছিলেন। সুতরাং আমরা বিদায় হজের দিন থেকে ৮১তম দিবস কত তারিখ ও কী বার হয়, তা গণনা করলে হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাতের তারিখ সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে পারি।


এ কথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, হযরত রাসুল (সা.) আরাফার ময়দানে বিদায় হজের ভাষণ দান কালে এ আয়াত নাজিল হয়েছে এবং ঐ দিনটি ছিল শুক্রবার। এ জন্যই শুক্রবার দিনের হজকে আকবরি হজ বলা হয়। এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। সুতরাং বিদায় হজ তথা দশম হিজরির ৯ই জিলহজ শুক্রবারকে ভিত্তি করে হিসাব করলে. হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাতের সঠিক তারিখ নির্ণয় করা সম্ভব। হযরত রাসুল (সা.)-এর হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী চান্দ্রবর্ষের এক মাস হয় ৩০ দিনে এবং পরবর্তী মাস হয় ২৯ দিনে। এই হিসাবে জিলহজ মাস ২৯ দিন, মহররম মাস ৩০ দিন ও সফর মাস ২৯ দিনে হয়। কাজেই দশম হিজরির ৯ই জিলহজ হতে হিসাব করলে দেখা যায়, জিলহজ মাসের ২১ দিন, মহররম মাসের ৩০ দিন, সফর মাসের ২৯ দিন এবং রবিউল আউয়াল মাসের ১ দিন তথা পহেলা তারিখ ২১+৩০+২৯+১=৮১তম দিবস। সুতরাং এ হিসাবে হযরত রাসুল (সা.) একাদশ হিজরির ১লা রবিউল আউয়াল ওফাত লাভ করেছিলেন।


এছাড়াও হযরত রাসুল (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার ওফাত লাাভ করেছিলেন, এ ব্যাপারেও সবাই একমত। আমরা দশম হিজরির ৯ই জিলহজ তারিখকে শুক্রবার ধরলে উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার পড়ে। এ হিসাবেও হযরত রাসুল (সা.) যে ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন তা প্রমাণিত হয়।
হযরত রাসুল (সা.)-এর জীবনী মোবারকের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা হতে জানা যায় যে, জীবনের শেষ ভাগে তিনি বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। তবে ওফাতের ৫ দিন পূর্বে তিনি হঠাৎ একদিন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেন। আর ঐ দিনটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার যা মুসলিম জাহানে ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ নামে পরিচিত। উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী একাদশ হিজরির ২৫শে সফর ছিল বুধবার। আর এ দিন ও তারিখ হতে পাঁচ দিন গণনা করলে একাদশ হিজরির ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার হয়। অন্যদিকে ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ যদি হযরত রাসুল (সা.)-এর জীবনের শেষ বুধবার হয়, আর তিনি যদি এর পরবর্তীতে অপর কোনো বুধবার না পেয়ে থাকেন, তবে আখেরি চাহার শোম্বা পরবর্তী সোমবারই হলো তাঁর ওফাত দিবস। সুতরাং ১লা রবিউল আউয়াল তারিখে হযরত রাসুল (সা.) ওফাত লাভ করেছিলেন বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়। সুতরাং উক্ত প্রমাণসহ তথ্যের হিসাবে চারদিক থেকেই ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার হয় বিধায় একথা নিশ্চিৎভাবে বলা যায় যে, হযরত রাসুল (সা.) একাদশ হিজরির ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ’-এর ২য় খণ্ডের ৩২৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে- জীবনের শেষ দিন সোমবার প্রত্যুষে হযরত রাসুল (সা.) দরজার পর্দা সরিয়ে সাহাবিদের নামাজ আদায়ের দৃশ্য অবলোকন করে পরম তৃপ্তি লাভ করেন। তাঁর যন্ত্রণাকাতর মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠে। তৃতীয় প্রহরে অন্তিম অবস্থা দেখা দিলো। বারবার তাঁর সংজ্ঞা লোপ পেতেছিল। চৈতন্য লাভের পর বারবার তিনি বলতে লাগলেন, ‘আর রফিকুল আলা’- অর্থাৎ- তিনিই (আল্লাহ্) শ্রেষ্ঠতম বন্ধু’। হযরত আলী (রা.) হযরত রাসুল (সা.)-এর মাথা মোবারক কোলে নিয়ে বসেছেন, এমন সময় একবার চোখ মেলে আলী (রা.)-এর দিকে তাকিয়ে হযরত রাসুল (সা.) অস্ফুট বলতে লাগলেন, “সাবধান! দাস-দাসীদের প্রতি নির্মম হয়ো না”। একবার বিবি আয়েশা (রা.)-এর বুকে মাথ রেখে শেষবারের মতো চোখ মেলে উচ্চ কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, সালাত সালাত, সাবধান! দাস-দাসীদের প্রতি সাবধান। অতঃপর শেষ নিঃশ্বাসের সাথে শেষ কথা উচ্চারণ করলেন, “হে আল্লাহ্! শ্রেষ্ঠতম বন্ধু।” ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার ৬৩ বছর বয়সে হযরত রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকাল হয় সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে।


হযরত রাসুল (সা.) ১লা রবিউল আউয়াল ওফাত লাভ করেছেন এটাই সঠিক ও নির্ভুল। সমাজে প্রচলিত ১২ই রবিউল আউয়াল তাঁর ওফাতের তারিখ নয়। কারণ দশম হিজরির ৯ই জিলহজ শুক্রবার হলে তিনটি মাসের সবকটি মাস যদি ৩০ দিন কিংবা ২৯ দিন হয়, তাহলে যে কোনোভাবেই হিসাব করা হোক না কেন, কোনো হিসাবেই একাদশ হিজরির ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার হয় না। এখন প্রশ্ন আসে, ১২ই রবিউল আউয়াল হযরত রাসুল (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের তারিখ হিসাবে কীভাবে প্রচারিত হলো?


এ প্রসঙ্গে বলতে হয় যে, উমাইয়া শাসনামলে এজিদপন্থীরা হযরত রাসুল (সা.)-এর জন্মদিনের আনন্দকে ¤øান করে দিয়ে মুসলমানদের এ দিনের রহমত ও বরকত হতে বঞ্চিত করার জন্য চক্রান্তমূলকভাবে তার জন্ম ও ওফাত একই তারিখে হয়েছে বলে প্রচার করেছে। কারণ হযরত রাসুল (সা.) ১লা রবিউল আউয়াল সূর্যাস্তের কয়েক মিনিট পূর্বে ওফাত লাভ করেছেন। তাঁর ওফাতের সংবাদ সবার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। চান্দ্রমাসের তারিখ সূর্যাস্তের পর থেকে গণনা করা হয় বিধায় কেউ কেউ বলেছেন তিনি ২রা রবিউল আউয়াল ওফাত লাভ করেছেন। ফলে হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাতের তারিখটি ১ অবলিক (/) ২ অর্থাৎ ১ অথবা ২ রবিউল আউয়াল হিসাবে প্রচারিত হয়। এ সুযোগে উমাইয়া শাসকরা হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাতের তারিখ ১ ও ২ কে একত্রিত করে অবলিককে উঠিয়ে একসাথে লিখে ১২ বানিয়ে, ১২ই রবিউল আউয়াল হিসাবে প্রচার করেছে। এ চক্রান্তের শিকার হয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ১২ই রবিউল আউয়ালকে হযরত রাসুল (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের তারিখ মনে করে এ দিনের উৎসব পালনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাতের দিন হলো একাদশ হিজরির ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার। সুতরাং তাঁর শুভ জন্মদিন ১২ই রবিউল আউয়াল তথা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.) উদ্যাপন করা আমাদের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।


প্রিয় পাঠক! রবিউল আউয়াল মাসটি হযরত রাসুল (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের সাথে মিশে আছে। কারণ দুটি তারিখই এ মাসে। তাই এ মাসের গুরুত্বকে আরোও বৃদ্ধি করেছে। তাই রবিউল আউয়াল মাসকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে আমাদেরকে বরণ ও পালন করতে হবে।


মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহ্র পরিচয় প্রকাশ করা। নবি-রাসুল প্রেরণের লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহ্র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাই আল্লাহ্কে পেতে হযরত রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ হযরত রাসুল (সা.) যা যা করেছেন বা করতে বলেছেন তা করতে হবে। আর যা করেননি বা করতে বারণ করছেন তা বর্জন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- “রাসুল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।” (সূরা হাশর ৫৯: আয়াত ৭) অন্যত্র বলা হয়েছে- “হে মাহ্বুব (সা.)! আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহ্কে ভালোবাসতে চাও তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ্ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন। অবশ্যই আল্লাহ্ পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়াময়।” (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ৩১) হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- “যে ব্যক্তি নিজের পিতামাতা, সন্তানসন্ততি ও অন্য সকল মানুষ অপেক্ষা আমাকে বেশি ভালো না বাসবে, সে মু’মিন হতে পারবে না।” (বোখারী শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭; এবং মুসলিম শরীফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯)


রবিউল আউয়াল মাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো পরিপূর্ণ জীবন বিধান। আল্লাহ্র কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম ইসলাম পূর্ণাঙ্গরূপে সর্বস্তরে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শান্তির ধর্ম ইসলামের সাম্য ও ন্যায় সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করা। আর এটাই নবি-রাসুল প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য যা পবিত্র কুরআনে বারবার বর্ণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন- “তিনি সেই সত্তা, যিনি প্রেরণ করেছেন তাঁর রাসুলকে কুরআনের পথনির্দেশ ও সত্য ধর্ম ইসলামসহ, অন্য সকল ধর্মের উপর ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য আর আল্লাহ্ সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট।” (সূরা ফাত্হ ৪৮: আয়াত ২৮)


রবিউল আউয়াল মাসের ফজিলত


হযরত রাসুল (সা.) এই মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এই মাসেই ওফাত লাভ করেছেন। তাই এ মাসটি মুসলমানের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। কারণ প্রকৃত মুসলিম হিসাবে বাঁচতে হলে আমাদের মহানবি হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কে ভালোবাসতে হবে এবং তাঁর দেখানো পথ ও জীবনযাপন আমাদের অনুসরণ করতে হবে। হযরত রাসুল (সা.) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন- “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ ও শেষ বিচারের দিনকে ভয় করে এবং আল্লাহ্কে অধিক পরিমাণ স্মরণ করে, তাদের জন্য অবশ্যই উত্তম আদর্শ রয়েছে রাসুলুল্লাহ্র মধ্যে।” (সূরা আহ্যাব ৩৩: আয়াত ২১)


তাই আমাদের উচিত আমাদের প্রিয় নবির আগমনের এই মাসকে কেন্দ্র করে আরো বেশি বেশি ইবাদত বন্দেগি করা। মহান আল্লাহ্র কাছে বেশি দোয়া করা, বেশি বেশি নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, হযরত রাসুল (সা.)-এর উপর দরুদ শরীফ পাঠ ও সালাম পেশ করা এবং আমাদের প্রিয় নবির আদর্শে নিজের জীবন গড়ে তোলা।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, রবিউল আউয়াল মাস আশেকে রাসুলের প্রাণের মাস, যে হযরত রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসে সে রবিউল আউয়ালকে ভালোবাসে। তাই এই মাসের আগমনে মু’মিনের অন্তরে নবি প্রেমের জোয়ার বইতে থাকে।


মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (রহ.) তাঁর জীবদ্দশায় হযরত রাসুল (সা.)-এর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ আশেকে রাসুলদেরকে নিয়ে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.) উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকায় আশেকে রাসুল (সা.) সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। শুধু তাই নয়, এই দিনকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়ে ১ দিনের ছুটি বাস্তবায়ন করিয়েছেন। যা আজ অবধি অব্যাহত আছে।
এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি মোহাম্মদী ইসলামের নেতৃত্ব প্রদানকারী ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা (মা. আ.) হুজুর গোটা বিশ্বে রাহ্মাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুল (সা.)-এর জন্মের অনুষ্ঠান ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.)-কে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।


[লেখক: ইসলামি আলোচক; সদস্য, দেওয়ানবাগীর দল ওলামা মিশন বাংলাদেশ, সাবেক খতিব, দারুল ফালাহ্ জামে মসজিদ, রিয়াদ, সৌদি আরব।]

সম্পর্কিত পোস্ট