শয়তানের পরিচয় এবং বিতাড়িত করার উপায়

 শয়তানের পরিচয় এবং বিতাড়িত করার উপায়

মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী, সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (রহ.) হুজুর কেবলাজান
[সূফী সম্রাট হুজুর কেব্লাজান রচিত ‘শান্তি কোন পথে?’ কিতাব থেকে লেখাটি সংকলন করা হয়েছে। সম্পাদক]

শয়তানের পরিচয়
শয়তান আরবি শব্দ। এর অর্থ বিতাড়িত বা বিভ্রান্ত, পাপাত্মা, অতিশয় দুর্বৃত্ত বা দুরাত্মা ব্যক্তি। শয়তান সত্য ধর্ম এবং সহজ সরল পথ থেকে বিচ্যুত, হিদায়েত গ্রহণে অস্বীকারকারী আত্ম-অহমিকায় বিভ্রান্ত এবং নাফরমানির কারণে অভিশপ্ত ও আল্লাহর নিকট থেকে বিতাড়িত। আর এ শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। যুগ পরিক্রমায় এই শয়তানের কুমন্ত্রণার ব্যাপারে প্রেরিত মহামানবগণ মানুষকে সতর্ক করেছেন। মহান আল্লাহ্ বলেন-“পিতা (ইয়াকুব (আ.) পুত্র ইউসুফকে] বললেন- হে বৎস! তোমার এ স্বপ্নবৃত্তান্ত তোমার ভাইদের কাছে ব্যক্ত করো না। তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে কোনো বিশেষ চক্রান্ত করবে। নিশ্চয় শয়তান মানুষের জন্য প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা ইউসুফ ১২: আয়াত ৫)

এই ইবলিশ শয়তান হযরত আদম (আ.)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করায় সে আল্লাহর হুকুম অমান্যকারী, কাফির হিসেবে চিহ্নিত হয়। আল্লাহ্ বলেন-“যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম-আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ব্যতীত সকলেই সিজদা করল। সে অমান্য করল ও অহংকার করল। সুতরাং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (সূরা আল বাকারাহ ২: আয়াত ৩৪)
প্রকৃতপক্ষে মানুষকে ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে রাখে শয়তান; মানুষের মাঝে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করে শয়তান; কুমন্ত্রণা দিয়ে মানুষকে পাপের কাজ করায় শয়তান। মহান আল্লাহ্ বলেন-“শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা এবং অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল বাকারাহ ২: আয়াত ২৬৮) এমনিভাবে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন-“নিশ্চয় শয়তান রক্ত চলাচলের ন্যায় বনি আদমের শিরায় শিরায় চলাচল করে থাকে।” (তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮১২) প্রকৃতপক্ষে শয়তান বলতে জিন ও মানুষের শয়তান প্রকৃতি সম্পন্ন চরিত্রকে বুঝায়।


শয়তানের অবস্থান
মানুষের অশুদ্ধ আত্মায় শয়তান অবস্থান করে। মানুষের নফ্স বা জীবাত্মা যখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে, অর্থাৎ নফ্সে আম্মারা হিসেবে থাকে, তখন ঐ নফ্সই শয়তানের কাজ করে থাকে। আল্লাহ্ বলেন-“আমি [ইউসুফ (আ.) বললেন-] নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, নিশ্চয় নফ্সে আম্মারা (মানুষের জীবাত্মা) মন্দ কাজেরই প্ররোচনা দিয়ে থাকে। তবে সে নয়, যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন।” (সূরা ইউসুফ ১২: আয়াত ৫৩)


শয়তানের অবস্থান প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন-“শয়তান কুমন্ত্রণা দেয় আত্মগোপন করে, আর সে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, হোক সে জিন জাতীয় এবং মানব জাতীয়।” (সূরা আন নাস ১১৪: আয়াত ৫ ও ৬)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন-“শয়তান আদম সন্তানের ক্বালব বা দিলের মাঝে অবস্থান করে। যখন সে আল্লাহর জিকির করে, শয়তান তখন সরে যায়। আর যখন যে (আল্লাহর জিকির থেকে) গাফেল হয়, তখন শয়তান তার দিলে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দিতে থাকে।” (বোখারীর সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ১৯৯)


এই শয়তান মানুষের রিপুসমূহকে কুপথে পরিচালিত করে এবং মানুষের দেহ ও মনে আধিপত্য বিস্তার করে, মানুষকে আল্লাহ্ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তখন ঐ মানুষ নিজেই শয়তানে পরিণত হয় এবং অন্য মানুষকেও কুমন্ত্রণা দিয়ে বিপথে পরিচালিত করে। আল্লাহ্ বলেন-“এভাবেই আমি মানুষ শয়তান ও জিন শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবির শত্রু করেছি, প্রতারণার উদ্দেশ্যে তাদের একে অন্যকে চমকপ্রদ বাক্য দ্বারা প্ররোচিত করে।” (সূরা আল আন‘আম ৬ : আয়াত ১১২) সুতরাং শয়তান কুপ্রবৃত্তিরূপে মানুষের নফ্স বা জীবাত্মায়ই অবস্থান করে।


শয়তানের প্রকারভেদ
শয়তান মূলত দু’প্রকার। যথা- ১। অদৃশ্যমান শয়তান ও ২। দৃশ্যমান শয়তান।
অদৃশ্যমান শয়তান হলো- শয়তান প্রবৃত্তিতে প্রভাবিত নফ্সে আম্মারা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- “নিশ্চয় নফ্সে আম্মারা (মানুষের জীবাত্মা) মন্দ কাজেরই প্ররোচনা দিয়ে থাকে।” (সূরা ইউসুফ ১২: আয়াত ৫৩) আর এ অদৃশ্যমান শয়তান, যা মানুষের নফ্সে সক্রিয় থাকে; এ শয়তান প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “তোমাদের প্রত্যেকের সাথেই শয়তান নিযুক্ত রয়েছে। এ কথা শ্রবণ করে সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন- ইয়া রাসুলাল্লাহু (সা.)! আপনার সাথেও কি আছে? আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন- হাঁ, আমার সাথেও। তবে মহান আল্লাহ্ আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে শয়তান আমার অনুগত হয়ে গিয়েছে। সে কেবল ভালো কাজেরই পরামর্শ দিয়ে থাকে।” (বোখারী ও মুসলিমের সূত্রে তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮১২)
অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন-“আমার শয়তান আমার হাতে মুসলমান হয়ে গিয়েছে।” (তাফসীরে জিলানী ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৯)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে শাকীক (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন-“প্রতিটি মানুষের ক্বালবে দুটি করে কক্ষ রয়েছে। তার একটিতে শয়তানের অবস্থান, আর ক্বালবের অন্য কক্ষটিতে ফেরেশতা অবস্থান করে। যখন মানুষের ক্বালবে আল্লাহর জিকির হয়, শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। আর সে যখন আল্লাহর জিকির থেকে বিরত হয়, তখন শয়তান ক্বালবের ভেতর কুমন্ত্রণা দিতে থাকে।” (তাফসীরে মাজহারী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৮) সুতরাং ষড়রিপুকে মানুষের পক্ষে নিজে নিজে সুপথে পরিচালিত হওয়া কঠিন। কারণ কু-রিপুসমূহ সাধারণত অসংযমী। অসংযমী রিপুসমূহকে কুপথ থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য অলী-আল্লাহ্গণের পরিশুদ্ধ আত্মা থেকে ফায়েজের শক্তির সাহায্য নিতে হয়। অন্যথায় অসংযমী রিপুসমূহ কুপথে ধাবিত হলে নফ্স অসংযমী হয়ে শয়তানের কাজ করে মানুষকে মন্দ কাজের দিকে ঠেলে দেয়। এজন্য বলা হয়-“যার পির বা মোর্শেদ নেই, তার পির শয়তান।” (সূফী দর্শন, পৃষ্ঠা ৩৯) প্রকৃতপক্ষে কু-রিপুর তাড়নাযুক্ত নফ্সকে ‘নফ্স শয়তান’ বলে। আর এটিই অদৃশ্যমান শয়তান, যা লোকচক্ষুর অন্তরালে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে।


অন্যদিকে দৃশ্যমান শয়তান হলো- নফ্স শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ ক্রমাগত মন্দ কাজ করতে করতে নিজেই শয়তানে পরিণত হয় এবং অন্য লোককে মন্দ কাজে প্ররোচনা দেয় ও ভালো কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। অন্যকে কুপ্ররোচনা দাতা এরূপ ব্যক্তিই মানুষ শয়তান, অর্থাৎ দৃশ্যমান শয়তান। আল্লাহ্ বলেন- “আমি মানুষ ও জিনদের মধ্যে শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবির শত্রু করেছি।” (সূরা আল আন‘আম ৬: আয়াত ১১২)


এ প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আন’আম (রহ.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন-“মানুষ হচ্ছে তিন প্রকার। যথা- ১। প্রথম প্রকার হচ্ছে- যাদেরকে আল্লাহ্ কিয়ামত দিবসে তাঁর আরশের ছায়া দেবেন। ২। দ্বিতীয় প্রকার মানুষ হচ্ছে- পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট। ৩। আর তৃতীয় প্রকার মানুষ হচ্ছে- আকৃতিতে মানুষ হলেও তারা অন্তরের দিক থেকে শয়তান।” (তাফসীরে দুররে মানছুর ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬১)


নফ্স শয়তান ব্যক্তির উপর ক্রিয়া করে ব্যক্তিকে মন্দ স্বভাবযুক্ত করে, অর্থাৎ এটি ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর। পক্ষান্তরে মানুষ শয়তান অন্য মানুষকে মন্দ স্বভাবযুক্ত করে সমাজের ক্ষতি করে। এই হিসেবে মানুষ শয়তান অধিকতর ভয়ংকর। এ জাতীয় মানুষ শয়তান প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন-“নিশ্চয় শয়তান তাদের (আমার বান্দাদের) মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়; শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭: আয়াত ৫৩) আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী মানুষকে জিন জাতির উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যে সমস্ত জিন অলী-আল্লাহর আনুগত্য করে না, তারা জিন শয়তান বা ইবলিশ।


বর্ণিত আছে, মানুষ যেমন সন্তানের জন্ম দেয়, তদ্রæপ ইবলিস শয়তানও সন্তান জন্ম দেয়। ইবলিসের সন্তানদের প্রসঙ্গে হযরত মুজাহিদ (রহ.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন-“এই ক’জন শয়তান হলো ইবলিসের বংশধর। যথা- লাকীন ও ওয়ালহান- পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে ও নামাজে এ শয়তান কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। হাফফাফ, মুররাহ ও যালানবুর, এদের কাজ হলো হাট-বাজারে মানুষকে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে প্ররোচিত করা, মিথ্যা শপথ করা এবং পণ্যের মিথ্যা প্রশংসা করতে উদ্বুদ্ধ করা। আওয়ার-এর কাজ হলো-ব্যভিচার করতে উৎসাহিত করা। এ শয়তান পুরুষ ও নারীর লজ্জাস্থানে ফুঁক মেরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে থাকে। মুতাওবিস এর কাজ হলো- মানুষের মুখে মুখে মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো, যে সংবাদের কোনো ভিত্তি নেই। ইয়াসূর-এর কাজ হলো- মানুষের বিপদ সংঘটিত করা, তাদের মুখমণ্ডলে আঘাত করা, ক্ষত সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে বস্ত্রহীন করে দেওয়া এবং দাসিম-এর কাজ হলো- যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর জিকির ও সালাম দেওয়া ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করে, তখন এ শয়তানই তাকে তার ঘরের সব আসবাবপত্রকে এলোমেলো করে দেখায়। আর সে যখন বিসমিল্লাহ বলা ব্যতীত আহার শুরু করে, তখন ঐ শয়তান তার সাথে আহার করতে শুরু করে।” (তাফসীরে মাজহারী ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯০)


তবে উল্লিখিত হাদিস ইবলিস শয়তান ও তার সন্তানদের কর্মপ্রণালীর যে বিবরণ উল্লেখ করা হলো, এ সকল শয়তানই জিন শয়তানের অন্তর্ভুক্ত। আর এ জিন শয়তানও অদৃশ্য শয়তানের অন্তর্ভুক্ত। অধিকন্তু মহান আল্লাহ্ জিন শয়তান ছাড়ও নফ্স শয়তান ও মানুষ শয়তানের অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছেন। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ্ বলেন-“হে রাসুল (সা.) আপনি বলুন, আমি মানুষের একমাত্র প্রতিপালক, মালিক ও উপাস্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তার অপকারিতা থেকে, যে মানুষের অন্তরে আত্মগোপন করে কুমন্ত্রণা দেয়, আর প্ররোচনা দানকারী জিন হতে ও মানুষ হতে।” (সূরা আন নাস ১১৪: আয়াত ১ থেকে ৬)

শয়তান বিতাড়িত করার উপায়
শয়তান বিতাড়ন বলতে মানুষের নফ্স থেকে শয়তানের প্রবৃত্তি দূরীভূত করাকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ নফ্সে আম্মারা বা অসংযমী নফ্স পরিশুদ্ধ হয়ে যখন স্রষ্টার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে, তখন সে শান্তি লাভ করে। মহান আল্লাহ্ বলেন-“হে মু’মিনগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শক্র।” (সূরা আল বাকারাহ ২: আয়াত ২০৮)
হযরত রাসুল (সা.) সাহাবিদের লক্ষ্য করে এক পর্যায়ে বলেছেন- তোমাদের ভেতর যেরূপ শয়তান আছে, আমার ভেতরও তদ্রæপ শয়তান আছে। আমার শয়তানকে আমি মুসলমান করেছি, কিন্তু তোমাদের শয়তান এখনো মুসলমান হয়নি। শয়তানকে মুসলমান করা বলতে সাধনার মাধ্যমে নফ্স পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা বুঝায়। আল্লাহ্ বলেন-“যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো কাজে আসবে না, সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহর নিকট আসবে পরিশুদ্ধ ক্বালব বা অন্তর নিয়ে।” (সূরা আশ শু‘আরা ২৬: আয়াত ৮৮ ও ৮৯)
এমনিভাবে ওহির বাণী আল কুরআনের অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে-“নিশ্চয় নূহ (আ.)-এর অনুগামীদের মধ্যে ছিলেন ইব্রাহীম (আ.)! স্মরণ করুন, তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে পরিশুদ্ধ ক্বালব বা অন্তর নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।” (সূরা আস সাফফাত ৩৭: আয়াত ৮৩ ও ৮৪)
বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক, কুল-কায়েনাতের রহমত হযরত রাসুল (সা.)-এর সুমহান শিক্ষা (শরিয়ত ও মারেফত) বাস্তবায়ন এবং অনুশীলনের মাধ্যমে নফ্সকে অবশ্যই মুসলমান করা যায়। অর্থাৎ শয়তানের প্রবৃত্তি মুক্ত করা যায়। বিষয়টি মহান আল্লাহ্ তাঁর জবানেই পরিষ্কার করেছেন। এরশাদ হচ্ছে-“অবশ্যই আল্লাহ্ মু’মিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তিনি তাদের কাছে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহর আয়াত তাদের পাঠ করে শুনান, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের শিক্ষা দেন, কিতাব ও হিকমত; যদিও তারা পূর্বে প্রকাশ্য গোমরাহিতে ছিল।” (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ১৬৪)
প্রকৃতপক্ষে নফ্স থেকে শয়তান বিতাড়িত করতে হলে সর্বপ্রথম অন্তরে আল্লাহর জিকির জারি করতে হয় এবং সাধনার মাধ্যমে নফ্সকে শয়তানের প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করে নিয়ে, নিজেকে হাকিকতে মুসলমান করতে হয়। এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন-“নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের ক্বালবে ঠোঁট বসিয়ে অবস্থান করে থাকে। অতঃপর ক্বালব আল্লাহর জিকিরে মশগুল হলে, শয়তান সরে যায়। আর ক্বালব আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল হলে, শয়তান ক্বালবের উপর পুরোপুরি ক্ষমতা বিস্তার করে (ক্বালবকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে) যায়। আর এটিই আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান।” (তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮১৩)
নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগে রাসুলের হিদায়েতের নুরের উত্তরাধিকারী অলী-আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে, তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ অনুশীলনের মাধ্যমে শয়তানকে বিতাড়িত করা সম্ভব। অর্থাৎ শয়তানের কু-প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায়।


অপরাধী শয়তান কীভাবে শাস্তি পায়?
মানুষ অপরাধ করে এবং অপরাধী হিসেবে তাকেই শাস্তি ভোগ করতে হয়। অথচ আমরা বলে থাকি, শয়তান মানুষকে অপরাধ করায়। এজন্য বিচার দিবসে মহান আল্লাহ্ বলবেন-“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্য স্থির করেছিল, তাকে কঠোর আজাবে নিক্ষেপ করো। তার সঙ্গী শয়তান বলবে- হে আমাদের প্রতিপালক! আমি তাকে অবাধ্যতায় লিপ্ত করিনি। বস্তুত সে নিজেই ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।” (সূরা ক্বাফ ৫০: আয়াত ২৬ ও ২৭)
প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কর্মের জন্য দায়ী। মহান আল্লাহ্ এরূপ নন যে, ইবলিস শয়তান মানুষকে দিয়ে পাপ কাজ করাবে, আর মহান আল্লাহ্ সে পাপের কারণে মানুষকে দায়ী করে শাস্তি দেবেন। বরং মহান আল্লাহ্ ন্যায় বিচারক, তিনি যার যার কর্মের জন্য কেবল তাকেই দায়ী করবেন। আল্লাহ্ বলেন-“প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ।” (সূরা আল মুদ্দাছছির ৭৪: আয়াত ৩৮) অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি কোনো পাপ কাজ করে, সে শুধু নিজের ক্ষতির জন্যই করে। আল্লাহ্ সবকিছু জানেন, তিনি মহাজ্ঞানী।” (সূরা আন নিসা ৪: আয়াত ১১১)
বিষয়টি অন্য আয়াতে আরো বেশি সুষ্পষ্ট করা হয়েছে। আল্লাহ্ বলেন-“হে রাসুল (সা.) তাদের (আদম সন্তানের) উপর শয়তানের কোনো প্রভাব ছিল না, তবে কে আখিরাতে ইমান রাখে এবং কে তাতে সন্দেহ পোষণ করে, তা প্রকাশ করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। আপনার প্রতিপালক সর্ববিষয়ের হেফাজতকারী।” (সূরা সাবা ৩৪: আয়াত ২১)


সত্যিকার অর্থে শয়তানই যদি মানুষকে পাপের কাজ করিয়ে থাকে, তাহলে বিচার শয়তানেরই শাস্তি হওয়া উচিত। কোনো আসামী যদি বিচারকের সামনে শপথ করেও বলে, অপরাধ সে করেনি এবং তার অপরাধের জন্য দায়ী শয়তান, তবুও শাস্তি আসামীকেই পেতে হবে। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, তবে কি নির্দোষ ব্যক্তিই শাস্তি ভোগ করল? সূ² বিচারে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে শয়তানই শাস্তি পেয়েছে। কেননা শয়তান বাইরের কেউ নয়, কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় অপরাধকারী ব্যক্তি নিজেই শয়তান। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন-“আমি মানুষ ও জিনদের মধ্যে শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবির শত্রু করেছি।” (সূরা আল আন আম ৬: আয়াত ১১২)
অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, আল্লাহ্ বলেন-“আমি অপরাধী লোকদেরকে (মানুষ শয়তানকে) প্রত্যেক নবির শত্রু করেছি।” (সূরা আল ফুরকান ২৫: আয়াত ৩১) এ প্রসঙ্গে হযরত আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাকে বললেন-“হে আবু যর! তুমি কি জিন শয়তান এবং মানুষ শয়তানের অনিষ্ট হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছ? হযরত আবু যর (রা.) বললেন- আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! মানুষের মধ্যেও কি শয়তান রয়েছে? আল্লাহর রাসুল (সা.) জবাব দিলেন- হ্যাঁ, আর মানুষ শয়তান তো জিন শয়তান থেকেও বেশি অনিষ্টকর।” (তাফসীরে কাবীর ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৭৪)
সুতরাং মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর বাণীসমূহে বিষয়টি সুস্পষ্ট, নফ্স বা কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় পাপকর্ম সম্পাদনকারী ব্যক্তি নিজেই শয়তান। আর অপরাধী ব্যক্তি শাস্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধী শয়তান শাস্তি পেয়ে থাকে।
[লেখক: দেওয়ানবাগ শরীফের প্রতিষ্ঠাতা]